Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

মাদকাসক্তি: ইসলামে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, মহানবীর (সা.) সতর্কবার্তা

Icon

ইসলাম ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৮ পিএম

মাদকাসক্তি: ইসলামে কঠোর নিষেধাজ্ঞা, মহানবীর (সা.) সতর্কবার্তা

বিজ্ঞাপন

মাদক শুধু একটি ব্যক্তিগত বদঅভ্যাস নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া একটি ভয়াবহ ব্যাধি। নেশা মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে নষ্ট করে দেয়। এ কারণে ইসলাম শুরু থেকেই মদসহ সব ধরনের নেশাজাতীয় বস্তু কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। পবিত্র কুরআন মাদককে শয়তানের অপকর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিক হাদিসে মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে উম্মতকে সতর্ক করেছেন।

কুরআনের নির্দেশ: মাদক শয়তানের অপকর্ম

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ۝ إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنْتُمْ مُّنتَهُونَ

‘হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদী এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকো, যাতে সফলকাম হতে পারো। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে বিরত রাখতে চায়। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৯০–৯১)

যদিও আয়াতে ‘মদ’-এর কথা এসেছে, ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি অনুযায়ী প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত।

সব নেশাজাতীয় বস্তুই হারাম

হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ

‘প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই মদ এবং প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তুই হারাম।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় মদ পান করে এবং তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, সে জান্নাতের পানীয় থেকে বঞ্চিত হবে।’ (মুসলিম ২০০৩)

এ হাদিস স্পষ্ট করে যে, মদের বিধান সব ধরনের নেশাজাতীয় বস্তুর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

মাদকাসক্তি ও নামাজের সওয়াব

মাদক মানুষের ইমানি চেতনা দুর্বল করে এবং ইবাদতের স্বাদ নষ্ট করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةُ أَرْبَعِينَ صَبَاحًا...

‘যে ব্যক্তি মদ পান করবে, তার চল্লিশ সকাল পর্যন্ত নামাজ (সওয়াবের দিক থেকে) কবুল হবে না। তবে সে যদি তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন... আর যদি বারবার একই অপরাধে লিপ্ত থাকে, তবে তার জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে।’ (তিরমিজি ১৮৬২)

আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এখানে ‘নামাজ কবুল হবে না’ বলতে নামাজের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া বোঝানো হয়েছে; ফরজ আদায়ের দায়িত্ব কিন্তু বহাল থাকে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তি কি নামাজ ছেড়ে দেবে?

এর উত্তর হলো— কখনোই নয়।

মাদক গ্রহণ করা যেমন হারাম, তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও ফরজ। তাই মাদকাসক্ত ব্যক্তি যদি নামাজ ছেড়ে দেয়, তাহলে সে দুটি গুনাহে জড়িয়ে পড়বে—একটি মাদক গ্রহণের, অন্যটি ফরজ নামাজ ত্যাগের।

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, মদপায়ীর নামাজ কবুল না হওয়ার অর্থ হলো, সে নামাজের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে; তবে তার ফরজ আদায় হয়ে যাবে এবং পুনরায় তা আদায় করতে হবে না। (আল-মিনহাজ শরহু সহিহ মুসলিম, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২২৪)

অতএব, কেউ মাদকাসক্ত হলেও তাকে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে হবে এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে মুক্তির জন্য দোয়া করতে হবে।

আরও পড়ুন
তওবার দরজা সবসময় খোলা

কিছু হাদিসে বারবার মদ্যপানের পর তওবা কবুল না হওয়ার সতর্কবার্তা এসেছে। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এর উদ্দেশ্য মানুষকে ভয়াবহ পরিণতির ব্যাপারে সতর্ক করা। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ الْعَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ

‘বান্দার প্রাণ কণ্ঠনালীতে পৌঁছার (মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত আসার) আগে পর্যন্ত আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ ৬৪০৮, তিরমিজি ৩৫৩৭)

এ হাদিস আল্লাহর অসীম দয়ার ঘোষণা। তাই কোনো গুনাহগারই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে পারে না।

মাদকের সঙ্গে জড়িত সবাই গুনাহগার

ইসলাম শুধু মাদক পানকেই নিষিদ্ধ করেনি; বরং এর উৎপাদন, বিক্রি, বহন কিংবা সহযোগিতাকেও সমানভাবে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

لَعَنَ اللَّهُ الْخَمْرَ، وَشَارِبَهَا، وَسَاقِيَهَا، وَبَائِعَهَا، وَمُبْتَاعَهَا، وَعَاصِرَهَا، وَمُعْتَصِرَهَا، وَحَامِلَهَا، وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ

‘আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন মদের ওপর, মদপায়ী, মদ পরিবেশনকারী, বিক্রেতা, ক্রেতা, প্রস্তুতকারক, যার জন্য প্রস্তুত করা হয়, বহনকারী এবং যার কাছে বহন করা হয়—সবার ওপর।’ (আবু দাউদ ৩৬৭৪)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মাদকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা ইসলামে সমানভাবে নিন্দনীয়।

মাদকাসক্তি শুধু একটি পাপ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ধ্বংসের কারণ। ইসলাম মানুষের জীবন, বিবেক ও ইমান রক্ষার জন্য মাদককে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো নিজে সব ধরনের নেশাজাতীয় বস্তু থেকে দূরে থাকা, অন্যকে এ পথে উৎসাহিত না করা এবং সমাজকে মাদকমুক্ত রাখতে সচেষ্ট হওয়া। কেউ যদি ইতোমধ্যে এ ভয়াবহ আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে, তবে তার জন্য হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। আন্তরিক তওবা, নিয়মিত নামাজ, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তার মাধ্যমে সে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। কারণ আল্লাহ তাআলা তার অনুতপ্ত বান্দাকে ভালোবাসেন এবং তার রহমতের দরজা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খোলা রাখেন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার