বিজ্ঞাপন
বিয়েতে ‘গায়ে হলুদ’: ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ নাকি অবৈধ?
ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
বিবাহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত এবং মানবজীবনের অন্যতম পবিত্র বন্ধন। এটি শুধু দুইজন মানুষের মিলন নয়; বরং দুটি পরিবারের মধ্যে ভালোবাসা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার সূচনা। তাই ইসলামে বিবাহকে সহজ, বরকতময় এবং শরিয়াহসম্মতভাবে সম্পন্ন করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে মুসলিম সমাজে বিয়ে উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্যে ‘গায়ে হলুদ’ অন্যতম। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই আয়োজন কি ইসলামে বৈধ? এর সীমারেখা কী? আসুন, কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।
ইসলাম আনন্দকে নিষিদ্ধ করেনি
ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ-উল্লাসকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং তা যেন শালীনতা ও আল্লাহর নির্দেশনার মধ্যে থাকে, সে শিক্ষা দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবাহ উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন এবং ওয়ালিমা করারও নির্দেশ দিয়েছেন।
হজরত আব্দুর রহমান ইবন আওফ (রা.)-কে নবী (সা.) তার শরীরে হলুদের চিহ্ন দেখে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, তিনি বিবাহ করেছেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ওয়ালিমা করার নির্দেশ দেন।’ (বুখারি ৩৯৩৭)
উপরোক্ত ঘটনার আলোকে প্রচলিত গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানকে বৈধতা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ প্রচলিত গায়ে হলুদ প্রথার সঙ্গে উক্ত ঘটনার সামান্যতম সম্পর্ক নেই। কারণ—
১. সাহাবির গায়ে লেগে থাকা দ্রব্যটি ছিলো মূলত সুগন্ধি দ্রব্য, যেটা জাফরান বা জাফরান ও অন্যান্য দ্রব্যের সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হতো।
২. হাদিসে যে হলুদ বর্ণের উল্লখ রয়েছে তা ছিলো মূলত এ জাফরান ও অন্যান্য সুগন্ধি দ্রব্যের চিহ্ন।
৩. হলুদ সুগন্ধির ব্যবহারটা ছিলো বাসর রাতকেন্দ্রিক।
৪. জাফরান সংশ্লিষ্ট এ সুগন্ধি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রা. নিজে ব্যবহার করেন নি। বরং সেটা তার স্ত্রীর ব্যবহার করা রং থেকে তার দেহে বা পোষাকে লেগেছিলো। কারণ হাদিসে পুরুষের জন্য জাফরান রং ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা এসেছে। (মুসলিম ২১১০)
প্রথম সারির একজন সাহাবি নববি নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করবেন তা কল্পনাও করা যায় না। ইমাম বদরুদ্দীন আইনী রহ. এ বক্তবটি উল্লেখ করেছেন। (উমদাতুল কারী ১৭/২৩৮)
৫. হিন্দু ধর্মাবলম্বীগণ দীর্ঘস্থায়ী বিবাহিত জীবন, বংশবিস্তার, নবদম্পতির সুখ-শান্তি কামনা এবং অপশক্তির প্রভাব দূর করতে ধর্মীয় আবশ্যকীয় রীতি হিসেবে এ গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। যা স্পষ্ট শিরক।
৬. বস্তুত হিন্দুধর্মালম্বী ও আদিবাসী উপজাতীদের থেকেই গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানের উৎপত্তি হয়েছে। সেখান থেকে মুসলিম সমাজে এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মুসলিম সংস্কৃতিতে গায়ে হলুদের অবস্থান কোনো কালেই ছিলো না।
সুতরাং ইসলাম তথা মুসলিমদের বিয়ে উপলক্ষে গায়ে হলুদ কোনোভাবেই জায়েজ নয়।
এ হাদিসে হলুদের চিহ্নের উল্লেখ রয়েছে, তবে এটি বর্তমান সমাজে প্রচলিত ‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠানের পক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি দলিল নয়।
গায়ে হলুদের বিধান কী?
শুধু হলুদ ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তবে কোনো অনুষ্ঠান যদি নিম্নোক্ত হারাম বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সেই বিষয়গুলোই হারাম হবে। যেমন—
- গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
- পর্দার লঙ্ঘন।
- গায়রে মাহরামের স্পর্শ।
- অশ্লীল বা ইসলামবিরোধী গান-বাজনা।
- অপচয় ও লোকদেখানো।
- ইসলামী আকিদার পরিপন্থী কোনো বিশ্বাস বা কুসংস্কার।
এসব বিষয় থেকে অনুষ্ঠানকে মুক্ত রাখা ইসলামের নির্দেশ।
উত্তম ও বরকতময় বিবাহ
أَعْظَمُ النِّكَاحِ بَرَكَةً أَيْسَرُهُ مَؤُونَةً
‘সর্বাধিক বরকতময় বিবাহ হলো, যার ব্যয় ও কষ্ট সবচেয়ে কম।’ (মুসনাদ আহমাদ ২৪৫২৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ
‘তোমাদের কারও মাথায় লোহার সূঁচ বিদ্ধ হওয়া তার জন্য এর চেয়ে উত্তম যে, সে এমন কোনো নারীকে স্পর্শ করুক, যে তার জন্য হালাল নয়।’ (তাবারানি ৪৮৬)
শরিয়াহসম্মত আনন্দ কেমন হবে?
যদি বিবাহের আনন্দ—
- ইসলামী শালীনতা বজায় রেখে হয়,
- নারী-পুরুষের পর্দা রক্ষা করা হয়,
- গায়রে মাহরামের স্পর্শ না থাকে,
- অশ্লীলতা ও হারাম কর্মকাণ্ড পরিহার করা হয়,
- অপচয় ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকে,
তাহলে তা ইসলামের সৌন্দর্যের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, কোনো অনুষ্ঠান যদি এসব সীমা অতিক্রম করে, তাহলে সেই হারাম কাজগুলো থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
ইসলাম আনন্দের ধর্ম, কিন্তু সীমাহীন আনন্দের নয়। বিবাহের মতো পবিত্র ইবাদতকে এমনভাবে উদযাপন করা উচিত, যাতে সেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি, শালীনতা ও বরকত বজায় থাকে। ‘গায়ে হলুদ’ নামটি নয়, বরং অনুষ্ঠানে কী হচ্ছে—সেটিই ইসলামী বিধানের মূল বিবেচ্য বিষয়। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, সংস্কৃতির ভালো দিকগুলো গ্রহণ করা এবং শরিয়াহবিরোধী সব রীতি ও অনুশীলন পরিহার করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সুন্নাহসম্মত, বরকতময় ও কল্যাণময় বিবাহের আয়োজন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।