Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

আফ্রিকার ‘মক্কা’ খ্যাত লারাবাঙ্গা মসজিদ স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়

Icon

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৭ পিএম

আফ্রিকার ‘মক্কা’ খ্যাত লারাবাঙ্গা মসজিদ স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়

বিজ্ঞাপন

ইসলামের ইতিহাস কেবল আরব উপদ্বীপেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে মুসলিম সভ্যতার গৌরবময় অসংখ্য নিদর্শন। আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডেও এমন অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে, যেগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামের আলো, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। ঘানার লারাবাঙ্গা মসজিদ তেমনই এক অনন্য স্থাপনা। ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলীর অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই মসজিদ আজ ‘পশ্চিম আফ্রিকার মক্কা’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। শুধু একটি উপাসনালয় নয়, এটি আফ্রিকায় ইসলামের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত প্রতীক।

আফ্রিকা মহাদেশের ‘গোল্ড কোস্ট’ নামে পরিচিত দেশ ঘানার সাভানা অঞ্চলের মুসলিমপ্রধান লারাবাঙ্গা গ্রামে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক লারাবাঙ্গা মসজিদ। এটি শুধু ঘানার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদই নয়, বরং সমগ্র পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনার মর্যাদা লাভ করেছে। ধর্মীয় গুরুত্ব, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিক আবেদন মিলিয়ে স্থানীয় মুসলিমদের কাছে এটি ‘পশ্চিম আফ্রিকার মক্কা’ নামে সুপরিচিত। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক, গবেষক ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে এখানে ছুটে আসেন।

লারাবাঙ্গা মসজিদকে ঘিরে লোকগাথা

লারাবাঙ্গা মসজিদের নির্মাণ ইতিহাসকে ঘিরে নানা কিংবদন্তি ও লোকগাথা প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৪২১ খ্রিষ্টাব্দে আইয়ুবা নামের এক মুসলিম ব্যবসায়ী সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করার সময় এই অঞ্চলের একটি রহস্যময় পাথরের পাশে রাতযাপন করেন। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে নির্দেশ পান, এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে হবে। বিস্ময়করভাবে পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখতে পান, মসজিদের ভিত্তি যেন অলৌকিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গেছে। এরপর সেই ভিত্তির ওপর তিনি মসজিদের বাকি অংশ নির্মাণ করেন।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আইয়ুবাকে মসজিদের পাশেই দাফন করা হয়। বলা হয়, তাঁর দাফনের তিন দিন পর কবরের ওপর একটি বাওবাব গাছ জন্ম নেয়, যা শত শত বছর পরও আজ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই গাছের পাতা ও কাণ্ডে ঔষধি গুণ রয়েছে এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় তা ব্যবহৃত হয়।

মসজিদের প্রতিষ্ঠা নিয়ে আরেকটি জনশ্রুতিও রয়েছে। এতে বলা হয়, ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে ব্রাইমাহ নামের এক ব্যক্তি যুদ্ধ শেষে একটি বল্লম নিক্ষেপ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন, বল্লমটি যেখানে গিয়ে পড়বে, সেখানেই তিনি বসতি স্থাপন করবেন। বল্লমটি একটি উঁচু ও উজ্জ্বল স্থানে গিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তিনি সেখানে নিজের বসতি গড়ে তোলেন এবং মসজিদটি নির্মাণ করেন। তিনি স্থানটির নাম দেন ‘লারাবাঙ্গা’, যার অর্থ—‘আরবদের ভূমি’।

জান্নাত থেকে আসা কুরআনের কিংবদন্তি

লারাবাঙ্গা মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ হলো এখানে সংরক্ষিত একটি অত্যন্ত প্রাচীন পবিত্র কুরআন মাজিদ। স্থানীয়দের বিশ্বাস, ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন ইমাম ইদান বারিমাহ ব্রামাহ গভীর আকুতি ও মোনাজাতের পর আল্লাহর পক্ষ থেকে এই কুরআন মাজিদ জান্নাতের উপহার হিসেবে তার কাছে নাজিল বা প্রেরিত হয়। যদিও এটি স্থানীয় লোকবিশ্বাসের অংশ, তবুও এই কুরআনকে ঘিরে মানুষের গভীর শ্রদ্ধা ও ধর্মীয় অনুভূতি আজও অটুট রয়েছে।

আরও পড়ুন
সুদানি-সাহেলিয়ান স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন

আধুনিক শহুরে মসজিদের তুলনায় লারাবাঙ্গা মসজিদ আকারে বেশ ছোট। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মাত্র ৮ মিটার × ৮ মিটার (প্রায় ২৬ ফুট × ২৬ ফুট)। মসজিদটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে কাদা, মাটি, খড় এবং নলখাগড়া—যা পশ্চিম আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী নির্মাণসামগ্রী।

মসজিদটি পশ্চিম আফ্রিকার বিখ্যাত সুদানি-সাহেলিয়ান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। এর নকশায় মালির বিখ্যাত জেনের বড় মসজিদ-এর প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। এই নির্মাণশৈলী ‘ফ্ল্যাট-ফুটেড অ্যাডোবি আর্কিটেকচার’ নামেও পরিচিত।

সম্পূর্ণ মসজিদটি সাদা চুনকামে আবৃত। এতে দুটি পিরামিড আকৃতির উঁচু টাওয়ার রয়েছে। পূর্ব পাশের টাওয়ারটি মক্কামুখী মিহরাব হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর উত্তর-পূর্ব কোণের টাওয়ারটি মিনারের ভূমিকা পালন করে। মাটির দেয়ালকে দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত রাখতে বাইরের দিকে ১২টি মৌচাকের মতো শক্তিশালী টেকো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব টেকোর ভেতর দিয়ে অনুভূমিকভাবে কাঠের বিম প্রবেশ করানো হয়েছে, যা পুরো কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করে এবং প্রয়োজন হলে সংস্কারকাজেও সহায়তা করে।

ঐতিহ্যের এক অমূল্য স্মারক

শত শত বছরের ইতিহাস, কিংবদন্তি, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং অনন্য স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে লারাবাঙ্গা মসজিদ আজ শুধু ঘানার নয়, সমগ্র আফ্রিকার ইসলামী ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। সময়ের অসংখ্য ঝড়-ঝাপটা পেরিয়েও এটি আজও অতীতের গৌরবময় ইতিহাস বহন করে চলেছে। তাই ‘পশ্চিম আফ্রিকার মক্কা’ নামে পরিচিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ কেবল একটি ইবাদতের স্থান নয়; বরং এটি আফ্রিকার ইসলামী সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন হিসেবে লারাবাঙ্গা মসজিদ তার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখে টিকে আছে। এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইসলামের আলো পৃথিবীর নানা প্রান্তে কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং কীভাবে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে সৃষ্টি করেছিল অনন্য স্থাপত্য ও ঐতিহ্য। তাই লারাবাঙ্গা মসজিদ শুধু ঘানার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; বরং এটি পশ্চিম আফ্রিকায় ইসলামের সমৃদ্ধ ইতিহাস, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য স্মারক, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার