Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

ইসলাম

দলবেঁধে বা সমস্বরে দোয়া করা কি সুন্নাহ সম্মত?

Icon

ইসলাম ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

দলবেঁধে বা সমস্বরে দোয়া করা কি সুন্নাহ সম্মত?

বিজ্ঞাপন

ইসলামে দোয়া একটি মহান ইবাদত। দোয়ার মাধ্যমে বান্দা সরাসরি আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের প্রয়োজন, কষ্ট ও আকাঙ্ক্ষা পেশ করে। তবে দোয়ার পদ্ধতি নিয়ে মুসলিম সমাজে নানা প্রশ্ন দেখা যায়।

এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—দলবেঁধে বা সমস্বরে দোয়া করা কি সুন্নাহসম্মত, নাকি এটি ইসলামে অনুমোদিত নয়?

বিশেষ করে নামাজের পর, ওয়াজ মাহফিলের শেষে বা কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উচ্চস্বরে দোয়া করার বিষয়টি আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত।

এই বিষয়ে কুরআন, হাদিস ও আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে সঠিক ধারণা নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

প্রথমেই বুঝতে হবে, দোয়ার মূল আদব হলো বিনয়, একাগ্রতা ও আল্লাহর সামনে নিজেকে অসহায় মনে করা।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনয়ের সঙ্গে ও গোপনে।” এই আয়াত সূরা আরাফের ৫৫ নম্বর আয়াতে এসেছে।

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, দোয়ার উত্তম পদ্ধতি হলো নীরবে, হৃদয়ের গভীরতা থেকে আল্লাহকে ডাকা। এতে রিয়া বা লোক দেখানোর আশঙ্কা কম থাকে এবং বান্দার একান্ত সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে গড়ে ওঠে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর দোয়ার পদ্ধতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, তিনি সাধারণত একাকী ও নীরবে দোয়া করতেন। সাহাবায়ে কেরামও ব্যক্তিগত দোয়ার ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতেন।

নামাজের পর তিনি সব সময় সমস্বরে দোয়া করতেন—এমন কোনো সহিহ হাদিস নেই। বরং অধিকাংশ হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি নির্দিষ্ট কিছু জিকির ও তাসবিহ পাঠ করতেন, যেমন সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার। এরপর কেউ চাইলে ব্যক্তিগতভাবে দোয়া করত।

তবে হাদিসে কিছু ক্ষেত্রে সম্মিলিত দোয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়। যেমন কোনো সফরে, কোনো বিপদের সময় বা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের নিয়ে দোয়া করেছেন।

যুদ্ধের সময় বা বৃষ্টির জন্য দোয়ার ক্ষেত্রে তিনি প্রকাশ্যে দোয়া করেছেন এবং সাহাবারা “আমিন” বলেছেন। এগুলো প্রমাণ করে যে, বিশেষ প্রয়োজন বা বিশেষ উপলক্ষে একসঙ্গে দোয়া করা জায়েজ।

কিন্তু এটিকে নিয়মিত অভ্যাস বানিয়ে ফেলা বা নামাজের পর বাধ্যতামূলক রীতি হিসেবে চালু করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়।

ফিকহবিদ ও মুহাদ্দিসগণ এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ মত দিয়েছেন। তারা বলেন, দলবেঁধে বা সমস্বরে দোয়া নিজেই হারাম নয়। তবে যদি এটিকে সুন্নাহ বা আবশ্যক আমল মনে করা হয়, তাহলে তা বিদআতের পর্যায়ে পড়ে যেতে পারে।

কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরাম নিয়মিতভাবে নামাজ শেষে সমস্বরে দোয়া করতেন না। তাই কোনো আমলকে দ্বীনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে তার প্রমাণ সুন্নাহ থেকে থাকতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দোয়ার উদ্দেশ্য ও পরিবেশ। যদি কোনো ইসলাহী মজলিসে একজন আলেম দোয়া করেন এবং অন্যরা “আমিন” বলেন, এতে মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি ও তাওবা সৃষ্টি হয়, তাহলে এতে কল্যাণ রয়েছে।

কিন্তু যদি দোয়া কেবল সামাজিক রীতি হয়ে যায়, যেখানে মনোযোগ নেই, অন্তরের অনুভূতি নেই, বরং শুধু শব্দ উচ্চারণ করা হয়, তাহলে সেই দোয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যায়।

আলেমরা আরও বলেন, দোয়ার সময় উচ্চস্বরে কান্নাকাটি বা বিশেষ ভঙ্গিতে দোয়া করাকে সুন্নাহ মনে করা ঠিক নয়। বরং দোয়ার আসল সৌন্দর্য হলো বিনয় ও আন্তরিকতা।

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো ভয় ও আশার সঙ্গে।”

এই আয়াত সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৯০-এ এসেছে। এখানে ভয় ও আশা মানে হলো অন্তরের অনুভূতি, কণ্ঠের উচ্চতা নয়।

সবশেষে বলা যায়, দলবেঁধে বা সমস্বরে দোয়া করা নিজে নিজে হারাম নয় এবং কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে তা জায়েজ ও উপকারী হতে পারে।

কিন্তু এটিকে নিয়মিত সুন্নাহ বা বাধ্যতামূলক আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা শরিয়তসম্মত নয়।

ইসলামের শিক্ষা হলো—দোয়া হবে বিনয়ের সঙ্গে, একাগ্রচিত্তে এবং আল্লাহর সামনে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে।

ব্যক্তি দোয়া হোক বা সম্মিলিত দোয়া—মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্তরের খাঁটি সম্পর্ক গড়ে তোলা, কেবল বাহ্যিক রীতিনীতি পালন নয়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার