বিজ্ঞাপন
নেতানিয়াহুর জোটে ধস, তবু ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে অনিশ্চয়তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৩ এএম
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট। আগের পার্লামেন্টে ৬৮টি আসন থাকলেও এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৩টিতে। এতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সুযোগ দেখছেন বিরোধীরা। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরও স্বস্তিতে নেই তারা। কারণ, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে আরব দলগুলোর সমর্থন দরকার হলেও তাদের সঙ্গে জোট করা নিয়ে বিরোধী শিবিরের মধ্যেই মতভেদ রয়েছে।
১২০ আসনের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। স্থানীয় সময় শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। এর মধ্যে তার দল লিকুদ পার্টির আসন ২৭। অন্যদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব জোট ও দল জয়েন্ট লিস্ট এবং রাআমের আসন ১৯টি। এই দুই পক্ষের সমর্থন পেলে বিরোধীদের আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে।
এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার দফায় দফায় বৈঠক করেছেন নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের নেতারা। ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান আলাদাভাবে বৈঠক করেন রাআমের চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাস, ইয়াশার পার্টির চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকট এবং বি’য়াচাদ দলের নেতা ইয়ার লাপিদের সঙ্গে। অন্যদিকে বি’য়াচাদ দলের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেটও বৈঠক করেন আইজেনকট ও গোলানের সঙ্গে।
এসব আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি। কারণ, তাদের সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের পক্ষে সরকার গঠনের মতো আসনসংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন।
টাইমস অব ইসরায়েল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সরকার গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী চার দলের মধ্যে তিন দল ইয়াশার, বি’য়াচাদ ও ইসরায়েল বেইতেনু আরব দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যুক্ত করে সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৬৭ হলেও বাস্তবে সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
টাইমস অব ইসরায়েল আরও জানিয়েছে, ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কেবল ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলের উদারপন্থী পত্রিকা হারেৎজ–এ মতামত কলামে গোলান আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের জোরালো আহ্বান জানান। কলামে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ইসরায়েলে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না।
তার যুক্তি, একজন আরব নাগরিকের ভোটের মূল্য একজন ইহুদি নাগরিকের ভোটের সমান। কয়েক লাখ নাগরিকের ভোট শুধু তাঁদের পরিচয় বা নামের কারণে অগ্রাহ্য করা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
নির্বাচনের ফলকে নেতানিয়াহুবিরোধী পক্ষের জয় হিসেবে দেখছেন লাপিদ। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, বিরোধীরা সরাসরি নিরঙ্কুশ জয় আশা করেছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। তবে নেতানিয়াহুর জোটের আসন আগের পার্লামেন্টের ৬৮ থেকে কমে ৫৩টিতে নেমেছে। লাপিদের ভাষায়, পয়েন্টের ব্যবধানে হলেও বিরোধীরা জিতেছেন।
লাপিদ আরও বলেন, নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসনের মধ্যে ১৩টি আসন অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দল দুটি নিজেদের জায়নবাদী বলে মনে করে না। এই ১৩ আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর পক্ষে থাকা বাকি আসনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০–এ।
বসে নেই প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। নিজেদের ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রাখতে তৎপর তিনি। বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইহুদিতের চেয়ারম্যান ইতামার বেন–গভিরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি।
দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান ডানপন্থী সরকার টিকিয়ে রাখা এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবাদে সমর্থনকারীদের সমর্থনপুষ্ট কোনো বামপন্থী সরকার গঠন ঠেকানোর বিষয়ে তারা আলোচনা করেন। একই দিন আরেক উগ্রপন্থী দল রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গেও বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। বৈঠকে পরবর্তী পদক্ষেপ সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। চ্যানেল ১৪-এর বরাতে টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, নেতানিয়াহু শরিকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গেই থাকব।’
সরকার গঠনের আলোচনার পাশাপাশি নেসেটের অধিবেশনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন গাদি আইজেনকট। তার দল পার্লামেন্ট বসার পরপরই কয়েকটি বিল উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সব ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ অথবা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন এবং বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
ইসরায়েলের নতুন পার্লামেন্টের শপথ অনুষ্ঠান আগামী ১০ নভেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার গঠনের আলোচনা তখনো শেষ না হলেও নির্ধারিত দিনেই নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান হবে। তবে জোট গঠনের আলোচনা অত্যন্ত জটিল হতে পারে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে আলোচনা চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কোনো কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে কি না, আর নেতানিয়াহু নিজের জোট ধরে রেখে অন্য দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে পারবেন কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশটির পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।
এদিকে নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতের প্রধান ডেভিড জিনি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইজেনকট।
তিনি বলেন, বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। পেশাদার সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক চাপকে পাত্তা না দিয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত শেষ করতে দিতে হবে।
একই সঙ্গে আইজেনকট অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদ সমন্বিতভাবে নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচার চালাচ্ছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান হতে দিতে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
শিন বেইত জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এর পরিসর অত্যন্ত সীমিত। তদন্তের অজুহাতে আইন মেনে ভোট দেওয়া আরব নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক নয়।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনেও ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তার মতে, নির্বাচন আইন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ মেলেনি।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল ও জেরুজালেম পোস্ট