বিজ্ঞাপন
১৩ নভেম্বর কি সত্যিই ধ্বংস হবে পৃথিবী, কী বলছে বিজ্ঞান?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪০ এএম
বিজ্ঞাপন
২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর কি থমকে যাবে পৃথিবীর জনজীবন? জনসংখ্যার চাপে কি ধ্বংসের মুখে পড়বে মানবসভ্যতা? শুনতে কল্পবিজ্ঞানের গল্প মনে হলেও প্রায় ছয় দশক আগে এমনই এক আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী হেইঞ্জ ভন ফোরস্টার। তার গাণিতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর বিশ্বের জনসংখ্যা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা, যখন তাত্ত্বিকভাবে তা অসীম হয়ে যাবে। দিনটিকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ডুমসডে’ বা মহাপ্রলয়ের দিন হিসেবে।
তবে তার এই পূর্বাভাসের পেছনে ছিল না কোনো যুদ্ধ, মহামারি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা। বরং জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি নিয়ে করা একটি গাণিতিক বিশ্লেষণ থেকেই এসেছিল এমন সিদ্ধান্ত। পূর্বাভাসে নির্ধারিত দিনটি যত এগিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ততই নতুন করে আলোচনায় আসছে পুরোনো সেই গবেষণা। কিন্তু সত্যিই কি ১৩ নভেম্বর পৃথিবীর জন্য কোনো বিপর্যয় অপেক্ষা করছে?
ক্ষুধায় নয়, জনসংখ্যার চাপে মৃত্যুর আশঙ্কা
১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের গবেষক হেইঞ্জ ভন ফোরস্টার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি সতর্ক করেছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মানুষ শুধু খাদ্যসংকটেই পড়বে না, বরং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে জীবনধারণ করাই কঠিন হয়ে উঠবে।
তার গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত বক্তব্য ছিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষুধায় মারা যাওয়ার বদলে একে অপরের চাপে নিষ্পেষিত হয়ে মারা যেতে পারে।
ফোরস্টারের ধারণা ছিল, মানুষের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে থাকলে পৃথিবীর ধারণক্ষমতা একসময় অতিক্রম করবে। এর পরিণতিতে তৈরি হবে ভয়াবহ সংকট। এই আশঙ্কার চূড়ান্ত সময় হিসেবে তিনি নির্ধারণ করেছিলেন ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর।
এই পূর্বাভাস তৈরিতে ফোরস্টার ও তার সহকর্মীরা দীর্ঘ সময়ের জনসংখ্যার তথ্য বিশ্লেষণ করেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা তাদের গবেষণার ভিত্তি ছিল।
তাদের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, প্রাচীনকালে বিশ্বের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হতে কয়েক শ বছর সময় লাগত। কিন্তু আধুনিক যুগে সেই সময় ক্রমেই কমে আসছিল। এই প্রবণতা ধরে তারা একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেন।
মডেলটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ২ হাজার ৫০০ কোটিতে পৌঁছানোর কথা ছিল। এরপর ২০২৬ সালের শেষ দিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গাণিতিক সমীকরণ এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা, যেখানে জনসংখ্যাকে তাত্ত্বিকভাবে অসীম হিসেবে দেখানো হয়।
এখানে ‘অসীম জনসংখ্যা’ বলতে বাস্তবে অসংখ্য মানুষের অস্তিত্ব বোঝানো হয়নি। এটি ছিল তাদের ব্যবহৃত গাণিতিক মডেলের একটি চূড়ান্ত সীমা বা সিঙ্গুলারিটি। ফোরস্টার এই পরিস্থিতিকেই ‘ডুমসডে’ নামে অভিহিত করেছিলেন।
কেন প্রশ্নের মুখে পড়েছিল পূর্বাভাস
গবেষণাটি প্রকাশের পর বিজ্ঞানী ও জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তবে অনেকেই ফোরস্টারের হিসাবের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সমালোচকদের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা ধরে ভবিষ্যতের হিসাব করা হলেও বাস্তবে জনসংখ্যা বাড়ার পেছনে অনেক বিষয় কাজ করে। শিক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর কর্মসংস্থান, পরিবার পরিকল্পনা, জন্মহার ও মৃত্যুহারের পরিবর্তন—এসব বিষয় জনসংখ্যার গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। কিন্তু ফোরস্টারের গাণিতিক মডেলে এসব পরিবর্তনের যথেষ্ট প্রতিফলন ছিল না।
বাস্তব পরিসংখ্যানও তার পূর্বাভাসের সঙ্গে মেলেনি। ১৯৫৮ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ কোটি। বর্তমানে তা ৮২০ কোটির কাছাকাছি। অর্থাৎ জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ফোরস্টারের মডেলে অনুমান করা ২০২০ সালের ২ হাজার ৫০০ কোটির ধারেকাছেও পৌঁছায়নি।
১৩ নভেম্বর নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হবে কিংবা জনসংখ্যা অসীম হয়ে যাবে—এমন ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ফোরস্টারের পূর্বাভাস ছিল নির্দিষ্ট কিছু তথ্য ও গাণিতিক অনুমানের ওপর দাঁড়ানো একটি তাত্ত্বিক হিসাব। বাস্তব পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতিপথ যে সেই হিসাব অনুসরণ করেনি, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।
তবে তার গবেষণার গুরুত্ব একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। পৃথিবীর সম্পদ সীমিত এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্য, পানি, বাসস্থান, জ্বালানি ও পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ে—এই বাস্তবতা তিনি বহু আগেই সামনে এনেছিলেন।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার, পরিবেশদূষণ ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার নিয়েও ভবিষ্যৎ মানবসমাজের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা চলছে। তাই ১৩ নভেম্বরকে পৃথিবীর শেষ দিন ভাবার কোনো কারণ নেই।