বিজ্ঞাপন
যেভাবে ২০ মিনিটেই হাওয়া ৭৮ হাজার কোটি টাকা
ক্রিপ্টো ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ চুরি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
বিজ্ঞাপন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সের প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার (প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা) হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। এটিকেই ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো চুরির ঘটনা বলে বর্ণনা করছেন বিশ্লেষকরা।
চুরির বিষয়টি সামনে আসার প চীনা বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান ধনকুবের চাংপেং ঝাওয়ের এই প্রতিষ্ঠানটি গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) থেকে জমা ও উত্তোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করে। একই সঙ্গে তারা সব ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে এক বিবৃতিতে জানায়, ব্যবহারকারীদের তহবিল সুরক্ষিত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ব্লকচেইন অ্যানালাইসিস ফার্ম দাবি করেছে, এই হামলার সূত্রপাত উত্তর কোরিয়া থেকে হয়েছিল।
জানা গেছে, বাইন্যান্স লেনদেন প্রক্রিয়াকরণের জন্য যে ওয়ালেটগুলো ব্যবহার করে, সেখান থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাইন্যান্স জানায়, তাদের এক কর্মীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মাধ্যমে এই অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি পরে যোগ করে, ‘অধিকতর তদন্তের পর আরও কিছু নতুন ত্রুটি ধরা পড়েছে।’
তাদের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি ১ বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন রিজার্ভের একটি সুরক্ষিত তহবিল পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। কো-সিইও রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, এই তহবিল এবং কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ থেকে সব ক্ষতি পুষিয়ে দেয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্লকচেইন অ্যানালিটিক্স ফার্ম টিআরএম ল্যাবসের তথ্য মতে, বাইন্যান্সের সাইনিং স্ট্রাকচারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়ালেটগুলোকে খালি করে দেয় হ্যাকাররা। ব্লকচেইন রেকর্ড অনুযায়ী, এই চুরির সিংহভাগই মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
তহবিল সরিয়ে নেয়ার পরপরই বাইন্যান্সের পার্টনার ও স্টেবলকয়েন প্রদানকারীদের নাগালের বাইরে তা সরানোর জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে হ্যাকাররা। ইতোমধ্যে এই চুরি যাওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক অংশই ফ্রিজ করা হয়েছে।
হংকংয়ের ক্রিপ্টো মামলা নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জশুয়া চু বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হ্যাকাররা হয়তো ভল্টের চাবি চুরি করেনি, তারা হয়তো সেই সিস্টেমটিকেই হাইজ্যাক করেছে যার মাধ্যম ভল্টকে টাকা ছাড়ের নির্দেশ দেয়া হয়।’
এর পেছনে কারা রয়েছে?
যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, এই হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের পূর্ববর্তী অপারেশনগুলোর মিল রয়েছে। টেং জানান, বাইন্যান্সের তদন্তে এখনও হামলাকারীদের শনাক্ত করা যায়নি।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া নিয়মিতভাবেই সাইবার হামলা এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে জেনেভায় উত্তর কোরিয়ার মিশন এবং চীনে দেশটির দূতাবাস রয়টার্সকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
টাকা কোথায় আছে?
চুরি যাওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেকই ছিল স্টেবলকয়েন, যা পরবর্তীতে টেথার, সার্কেল, রিপল এবং ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টো ভেঞ্চার ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সসহ বিভিন্ন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রিজ করেছে। এর মানে এই নয় যে, কয়েনগুলো বাইন্যান্সকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, তবে ফ্রিজ করার ফলে হ্যাকারদের কয়েনগুলোকে নগদ টাকায় রূপান্তরের পথ কঠিন হয়ে গেল।
ক্রিপ্টো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হ্যাকাররা অর্থ সরাতে চুরি যাওয়া কয়েনগুলোকে অন্য সম্পদের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলতে পারে অথবা কম পরিচিত কয়েন ও এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করতে পারে।
স্টেবলকয়েন কোম্পানি ট্রেস ফাইন্যান্সের সিইও বার্নার্ডো ব্রিটস বলেন, ‘যত বেশি সময় গড়াবে, অন্য কোনও এক্সচেঞ্জ বা পেমেন্ট প্রোভাইডারের কাছে সেই তহবিলগুলো সরিয়ে নেয়ার সম্ভাবনা তত কমবে। কারণ সেগুলো তখন কালোতালিকাভুক্ত হয়ে যাবে। বাস্তবে হ্যাকিং থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি বড় অংশ... (কেবল প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই) পাচার করা সম্ভব।’
এরপর কী?
টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি সাইবার হামলার মাধ্যমে ২৯০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছিল হ্যাকাররা।
নতুন করে এই হামলার পর ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমবে। যেমন শুক্রবারই (৩০ অক্টোবর) ক্রিপ্টোকারেন্সির দাম কমে গেছে এবং স্টেবলকয়েনের বাজারমূল্য হ্রাস পেয়েছে। যার অর্থ, বিনিয়োগকারীরা দ্রুত ডিজিটাল সম্পদ থেকে তাদের অর্থ তুলে নিচ্ছেন।