বিজ্ঞাপন
১৬ বছর বেতনসহ অসুস্থতার ছুটিতে শিক্ষিকা, অবশেষে স্কুবা ডাইভিং করতে গিয়ে ধরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম
বিজ্ঞাপন
জার্মানিতে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রায় ১৬ বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত পুরো বেতন নেওয়ার অভিযোগে এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা হয়েছে। ৬২ বছর বয়সী ওই নারী ২০০৯ সাল থেকে স্কুলে পড়াতে যাননি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বেতন পেয়েছেন এবং স্কুবা ডাইভিংয়ের মতো শারীরিক পরিশ্রমের কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর তাঁর অসুস্থতার সনদ এবং বেতন নেওয়ার বৈধতা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন জার্মানির সরকারি কর্মকর্তারা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ল্যাডবাইবেলের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি জার্মানির নর্থ রাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যের ভেসেল শহরের একটি সরকারি ভোকেশনাল বিজনেস কলেজের। অভিযুক্ত শিক্ষিকা ২০০৩ সাল থেকে ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। ২০০৯ সালে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কথা জানিয়ে তিনি অসুস্থতার ছুটি নেওয়া শুরু করেন। এরপর আর নিয়মিত শিক্ষকতায় ফিরে যাননি। তবে অসুস্থতার সনদ জমা দেওয়ার মাধ্যমে পুরো বেতন পেতে থাকেন।
জার্মান সংবাদমাধ্যম বিল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে কলেজটিতে নতুন প্রধান শিক্ষক যোগ দেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের বেতনভুক্ত কর্মীদের তালিকায় ওই শিক্ষিকার নাম থাকলেও তিনি তাঁকে চিনতেন না। এমনকি ওই শিক্ষিকার সঙ্গে তাঁর আগে কখনো পরিচয়ও হয়নি। তারপরও বছরের পর বছর সরকারি বেতন দেওয়া অব্যাহত ছিল।
পরবর্তী সময়ে কলেজের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসার পর দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা কর্মীদের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, একজন শিক্ষিকা প্রায় দেড় দশক ধরে কোনো ক্লাস না নিয়েও নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ২০২৪ সালে তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। তদন্তকারীরা তাঁর অসুস্থতার নথি, কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণ এবং ওই সময়ে তিনি কী ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন, তা পরীক্ষা শুরু করেন।
তদন্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে শিক্ষিকার স্কুবা ডাইভিংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। স্কুবা ডাইভিং হলো পানির নিচে বিশেষ শ্বাসপ্রশ্বাসের সরঞ্জাম ব্যবহার করে ডুব দেওয়ার একটি কার্যক্রম। এতে শারীরিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। তদন্তকারীদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন অসুস্থতার কারণে শিক্ষকতা করতে অক্ষম থাকার দাবি জানালেও তিনি কীভাবে এই ধরনের কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।
তবে স্কুবা ডাইভিংয়ে অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলেই তাঁর অসুস্থতার দাবি মিথ্যা হয়ে যায়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি তদন্তকারীরা। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত অসুস্থতা এবং বিভিন্ন শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। ফলে শিক্ষিকার প্রকৃত চিকিৎসাগত অবস্থা এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার যৌক্তিকতা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, ওই শিক্ষিকা ডাইভিংয়ের জন্য শারীরিকভাবে উপযুক্ত থাকার দুটি মেডিকেল সার্টিফিকেট জাল করে থাকতে পারেন। প্রসিকিউটরদের দাবি, এসব সনদে এমন একজন চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, যাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে। অভিযোগটি সত্য কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা হচ্ছে।
এদিকে দীর্ঘদিন অসুস্থতার ছুটিতে থাকা শিক্ষিকাকে সরকারি মেডিকেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ জানান। পরে আদালত কর্তৃপক্ষের নির্দেশ বহাল রাখেন এবং তাঁকে মেডিকেল পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে বলে সিদ্ধান্ত দেন।
এই ঘটনার আর্থিক দিকও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বিল্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ওই শিক্ষিকাকে দেওয়া বেতনের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ইউরো। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। তদন্তকারীরা এই অর্থকে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির হিসাব হিসেবে বিবেচনা করছেন।
তবে ২০০৯ সাল থেকে পুরো সময়ে তিনি মোট কত অর্থ পেয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের বছরগুলোর অনুপস্থিতি নিয়ে আইনগত সীমাবদ্ধতার কারণে তদন্তকারীরা মূলত ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের সময়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, শিক্ষিকা দীর্ঘ ১৬ বছরের অনুপস্থিতির সময় মোট ১০টি অসুস্থতার সনদ জমা দিয়েছিলেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু হওয়ার পর আরও একটি সনদ জমা দেওয়া হয়। তদন্তকারীরা এসব সনদের বৈধতা এবং সেগুলো ব্যবহার করে বেতন নেওয়ার বিষয়টি পরীক্ষা করছেন।
চলতি বছরের জুলাইয়ে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়। প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, ১১টি বিশেষ গুরুতর প্রতারণার ঘটনা এবং দুটি নথি জালিয়াতির অভিযোগে বিচার চালানোর মতো পর্যাপ্ত সন্দেহের ভিত্তি পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগ আনা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তাঁর দায় নির্ধারিত হবে।
জার্মানির আইন অনুযায়ী, গুরুতর প্রতারণার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। যদিও এই মামলায় শেষ পর্যন্ত কী সাজা হতে পারে, তা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষিকা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগের পাশাপাশি চাকরি ও অবসরসংক্রান্ত বিরোধও রয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তদন্তকারীরা আরও খতিয়ে দেখছেন, শিক্ষকতার চাকরিতে অসুস্থতার ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি বিকল্প চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট কোনো পেশায় কাজ করেছেন কি না। তাঁর ন্যাচারোপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তদন্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কাজে যুক্ত থাকার অভিযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে একজন সরকারি কর্মীর অনুপস্থিতি এবং নিয়মিত বেতন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলেও তিনি স্বীকার করেছেন। তবে তদন্ত চলমান থাকায় বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হননি।
এই ঘটনা জার্মানির সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং অসুস্থতার ছুটি পর্যবেক্ষণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা একজন শিক্ষিকার বেতন কীভাবে বছরের পর বছর চালু ছিল এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে কেন বিষয়টি আগে নজরে আসেনি, তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জার্মানিতে সরকারি কর্মীদের অসুস্থতার ছুটি ও বেতনসংক্রান্ত সুবিধা তাঁদের চাকরির ধরন এবং প্রযোজ্য বিধিমালার ওপর নির্ভর করে। তবে অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে কর্তৃপক্ষের চিকিৎসাগত মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক তদারকির সুযোগ রয়েছে। এই মামলায় সেই তদারকি যথাযথভাবে হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষিকার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও নথি জালিয়াতির অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে। স্কুবা ডাইভিংয়ের কর্মকাণ্ড এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত সনদের বৈধতা নিয়েও তদন্ত চলছে। আদালত এখনো তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেননি। ফলে ১৬ বছর বেতন নেওয়ার ঘটনা নিশ্চিত হলেও সেই অর্থ প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল কি না, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বিচারিক প্রক্রিয়ায়।