বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় না খেয়ে থাকছেন অনেকে, বিপাকে সাধারণ পরিবার
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২২ পিএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ এখন নিয়মিত খাবার খাওয়ার খরচও সামলাতে পারছেন না। নতুন এক জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক মানুষ জানিয়েছেন, খাবারের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে তাঁদের কখনো কখনো খাবার বাদ দিতে হয়েছে। শুধু খাবারের পরিমাণ কমানো নয়, স্বাস্থ্যকর খাবার কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের জন্য। আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেলফ ফাইন্যান্সিয়ালের জরিপে উঠে আসা এই তথ্য দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীদের ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ জানান, খাবারের দাম বাড়ার কারণে তাঁরা খাবার বাদ দিয়েছেন। আরও ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ বলেছেন, খরচ সামলাতে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। তবে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ও লিঙ্গের অনুপাত যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে না। ফলে এই ফলাফল থেকে দেশের অর্ধেক মানুষই খাবার বাদ দিচ্ছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
জরিপে দেখা গেছে, গত এক বছরে ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর গ্রোসারি খরচ বেড়েছে। যাঁদের খরচ বেড়েছে, তাঁদের মাসে গড়ে অতিরিক্ত ১৫২ ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। সেই হিসাবে বছরে অতিরিক্ত খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৮২৪ ডলার। একই আয়ে বাড়তি এই ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যান্য খরচ কমাতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারের আয়ের বড় অংশ রেন্ট, মর্টগেজ, গাড়ির কিস্তি ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে চলে যায়, তাদের জন্য গ্রোসারি খরচ বৃদ্ধি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
খাবারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু পরিবারের মাসিক বাজেটেই সীমাবদ্ধ নেই। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ জানিয়েছেন, বেশি দামের কারণে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে কেনাকাটার সময় তুলনামূলক সস্তা পণ্য বেছে নিচ্ছেন কিংবা খাবারের পরিমাণ কমাচ্ছেন। জরিপে খাবারের উচ্চমূল্য মানুষের মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তার ওপরও প্রভাব ফেলছে বলে উঠে এসেছে। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি এখন অনেকের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মূল্যস্ফীতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রোসারি পণ্যের দাম সামগ্রিকভাবে প্রায় ২৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে গ্রাউন্ড বিফের দাম প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং কফির দাম প্রায় ১০৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সব খাদ্যপণ্যের দাম একই হারে বাড়েনি। বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পার্থক্যের কারণে পরিবারের খাদ্যাভ্যাস ও কেনাকাটার ধরনের ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত খরচের পরিমাণও ভিন্ন হচ্ছে।
খাবারের দাম নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি অন্য জরিপেও উঠে এসেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট ও ইপসোস পরিচালিত জরিপে ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক জানান, তাঁদের কাছে গ্রোসারি পণ্যের দাম অসহনীয় মনে হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৪৫ শতাংশ। বছরে ৫০ হাজার ডলারের কম আয়ের পরিবারের মধ্যে ৮২ শতাংশ খাবারের দামকে অসহনীয় বলে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে বছরে এক লাখ ডলারের বেশি আয়ের পরিবারের মধ্যেও ৫৬ শতাংশ একই মত দিয়েছেন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের অক্টোবরের জরিপেও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত পরিচালিত ওই জরিপে ৭৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিক খাবার ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ৬৯ শতাংশ হেলথ কেয়ারের খরচ এবং ৬৬ শতাংশ আবাসন ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছেন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, শুধু গ্রোসারি নয়, পরিবারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খরচ একসঙ্গে সামলানো অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্যও খাবারের দাম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সদস্যসংখ্যা বেশি কিংবা একাধিক নির্ভরশীল সদস্য রয়েছেন, সেখানে মাসিক গ্রোসারি বাজেটের পরিবর্তন সরাসরি পারিবারিক ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ডিসকাউন্ট স্টোর থেকে কেনাকাটা, সাপ্তাহিক অফার ব্যবহার এবং তুলনামূলক কম দামের পণ্য বেছে নেওয়ার মাধ্যমে খরচ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। আয় ও অন্যান্য শর্ত পূরণকারী পরিবারগুলো স্ন্যাপের মতো সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির সুবিধাও পেতে পারেন।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম রাজনৈতিক আলোচনাতেও গুরুত্ব পাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। তবে খাবারের দাম বৃদ্ধির কারণে ঠিক কত মানুষ নিয়মিত খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছেন, তা নির্ধারণে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক গবেষণা প্রয়োজন। সেলফ ফাইন্যান্সিয়ালের জরিপটি অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে, উচ্চমূল্যের চাপ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কেনাকাটার অভ্যাস বদলানোর বাইরে গিয়ে দৈনন্দিন খাবার গ্রহণেও প্রভাব ফেলছে।