বিজ্ঞাপন
ব্রিটেনে নাপিতের দোকানে ইমিগ্রেশন অভিযান, পালাতে গিয়ে ভারতীয় নাগরিক গ্রেপ্তার
যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০৭ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যের পূর্ব লন্ডনের রমফোর্ড এলাকায় একটি নাপিতের দোকানে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে কাজ করার অভিযোগে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছেন ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তারা। ব্রিটেনে ভিজিট ভিসায় প্রবেশ করে কাজের অনুমতি ছাড়াই তিনি ওই দোকানে কর্মরত ছিলেন বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানের সময় দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত কর্মকর্তারা তাঁকে আটক করেন। ঘটনাটি ব্রিটেনজুড়ে অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।
ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তারা আগে থেকেই ওই নাপিতের দোকানে অবৈধভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়ে তথ্য পেয়েছিলেন। এরপর সেখানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। কর্মকর্তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজন কর্মী দোকানের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে তাঁকে আটক করে অভিবাসনসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা হয়।
কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ওই ব্যক্তি ভিজিট ভিসায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। সাধারণ ভিজিট ভিসায় দেশটিতে চাকরি করা কিংবা নিয়মিত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার অনুমতি থাকে না। নির্দিষ্ট কিছু অনুমোদিত কার্যক্রমের ব্যতিক্রম থাকলেও সাধারণভাবে নাপিতের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করা ভিজিট ভিসার আওতায় পড়ে না। ফলে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকেও একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এর মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কাজের বৈধ অনুমতি যাচাই এবং নিয়োগসংক্রান্ত নিয়ম অনুসরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। যুক্তরাজ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাজের অনুমতি নেই এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে পারে। তবে রমফোর্ডের ওই দোকানের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে চূড়ান্ত জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, এমন তথ্য নিশ্চিত হয়নি।
ব্রিটিশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী, নিয়োগকর্তাদের কর্মী নিয়োগের আগে তাঁর যুক্তরাজ্যে কাজ করার অধিকার রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হয়। এই প্রক্রিয়া ‘রাইট টু ওয়ার্ক চেক’ নামে পরিচিত। প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়া অবৈধভাবে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন কর্মীর জন্য সর্বোচ্চ ৬০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত দেওয়ানি জরিমানা হতে পারে। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী রেকর্ড, নিয়ম লঙ্ঘনের ধরন এবং অন্যান্য পরিস্থিতির ওপর।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অবৈধ কর্মসংস্থানের অভিযোগ তদন্তে দেশজুড়ে প্রায় ২৫ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযান ও পরিদর্শন চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১৭ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। আগের দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১২২ শতাংশ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অভিযানের সংখ্যা ১১১ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই পরিসংখ্যান ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত, অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত হালনাগাদ মোট হিসাব নয়।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই অবৈধ কর্মসংস্থানের অভিযোগে ৭ হাজার ২৭০টি অভিযান পরিচালনা করে ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট বিভাগ। এসব অভিযানে ৪ হাজার ৭৫৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে অবৈধ কর্মী নিয়োগের ঘটনায় এক হাজার ২০০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়ানি জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এসব জরিমানার সম্ভাব্য মোট পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের বেশি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অভিযান ও গ্রেপ্তার উভয়ই বেড়েছে।
ব্রিটিশ সরকার বিশেষভাবে নাপিতের দোকান, গাড়ি ধোয়ার প্রতিষ্ঠান, নখের সৌন্দর্যচর্চার দোকান, ছোট রেস্টুরেন্ট এবং নগদ অর্থের লেনদেন বেশি হয় এমন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নজরদারি বাড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানে অবৈধ কর্মসংস্থান, শ্রমিক শোষণ এবং অর্থসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে এসব খাতের সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত, এমন নয়। তদন্তের জন্য সুনির্দিষ্ট তথ্য ও সন্দেহের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছে সরকার।
অবৈধ অভিবাসন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ মোকাবিলায় ব্রিটিশ পুলিশ এবং ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট বিভাগ যৌথভাবেও অভিযান চালাচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত পরিচালিত ‘অপারেশন লকস্ট্রিম’ অভিযানে দেশজুড়ে ৪৫২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশকে অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। অভিযানে বিভিন্ন সড়ক ও পরিবহনপথে ছয় হাজারের বেশি গাড়ি পরীক্ষা করা হয় এবং অপরাধসংক্রান্ত সন্দেহে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সামগ্রী জব্দ করা হয়।
যুক্তরাজ্যে ভিজিট ভিসায় যাওয়া বাংলাদেশিসহ বিদেশি নাগরিকদের জন্যও এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই পর্যটন বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে ব্রিটেনে যান। তবে ভিজিট ভিসা থাকার অর্থ দেশটিতে সাধারণ চাকরি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করার অনুমতি পাওয়া নয়। ভিসার শর্ত ভঙ্গ করলে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের আবেদন এবং বর্তমান অভিবাসন অবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
একইভাবে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট, নাপিতের দোকান ও অন্যান্য ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্যও কর্মীদের রাইট টু ওয়ার্ক যাচাইয়ের নিয়ম গুরুত্বপূর্ণ। কর্মী নিয়োগের আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র যাচাই না করলে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো কর্মীকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অপরাধী সাব্যস্ত হয় না। অভিযোগের ধরন এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রমফোর্ডের এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তবে তাঁকে ইতিমধ্যে ডিপোর্ট করা হয়েছে কিংবা আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট নাপিতের দোকানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত জরিমানার সিদ্ধান্তের বিষয়টিও নিশ্চিত নয়। ঘটনাটি ব্রিটেনে অবৈধ কর্মসংস্থান মোকাবিলায় চলমান কঠোর অভিযানের একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।
সূত্র: যুক্তরাজ্যের হোম অফিস, ন্যাশনাল পুলিশ চিফস কাউন্সিল