বিজ্ঞাপন
ক্ষমতা ছাড়লেই কি গ্রেপ্তার হবেন নেতানিয়াহু?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪২ পিএম
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জোট গঠনের আলোচনা শেষে তাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হতে পারে। তবে এমনটা হলে তার সরকার বিদায় নিলেও তাকে এবং ইসরায়েলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আইনি কার্যক্রম চলতে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাতিল হবে না। একইভাবে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলাও বন্ধ হবে না। তবে পদ ছাড়লে নেতানিয়াহু সেই ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন, যার যুক্তি দেখিয়ে কিছু দেশ তাকে গ্রেপ্তার করা থেকে বিরত থাকার কথা বলেছে। এতে আইসিসির পরোয়ানা এবং বিদেশি দেশের জাতীয় আদালতে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি তার জন্য আরও বাড়তে পারে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় কথিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে অনাহারকে ব্যবহার, হত্যা ও নিপীড়ন।
এ ছাড়া গত বছর গাজায় ত্রাণবাহী একটি নৌবহর আটকে দেওয়ার ঘটনায় নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে তুরস্কে নেতানিয়াহুর অনুপস্থিতিতে বিচার চলছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।
আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কি বহাল থাকবে?
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সংঘটিত কর্মকাণ্ডে তার কথিত ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি পদে থাকছেন কি না, তার ওপর পরোয়ানার কার্যকারিতা নির্ভর করে না।
তবে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করে আদালতের কাছে হস্তান্তর করা না হলে তার বিচার শুরু করা সম্ভব নয়।
আইসিসির রোম সংবিধির ৫৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আদালত অন্য কোনো নির্দেশ না দিলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকে।
আইসিসির উপপ্রধান প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান গত সেপ্টেম্বরে বলেছিলেন, পরোয়ানা প্রত্যাহারের বিষয়ে আদালত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
তবে ইসরায়েল এখনো আইসিসির এখতিয়ার নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে। দেশটির প্রধান যুক্তি, তারা আদালতের প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তি রোম সংবিধির সদস্য নয়।
২০২৫ সালের এপ্রিলে আইসিসির আপিল বিভাগ প্রাক-বিচার বিভাগকে ইসরায়েলের আপত্তি পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়। তবে পর্যালোচনা চলাকালে বিচারকেরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা স্থগিত করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে ইসরায়েলের করা দুটি আপিল এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
নেতানিয়াহু কি দায়মুক্তি হারাবেন?
আইসিসির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার কারণে নেতানিয়াহু দায়মুক্তি পান না। রোম সংবিধির ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সরকারি পদমর্যাদা কাউকে বিচারের আওতার বাইরে রাখে না। আদালতের অবস্থান হলো, সরকারি পদসংশ্লিষ্ট দায়মুক্তি কোনো সন্দেহভাজনকে আদালতের এখতিয়ার থেকে সুরক্ষা দেয় না। একইভাবে, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ওপর আদালতের গ্রেপ্তারি অনুরোধ কার্যকর করার বাধ্যবাধকতাও এতে উঠে যায় না।
আইসিসি সদস্য নয়, এমন দেশের নেতাদের ক্ষেত্রেও আদালত এই অবস্থান প্রয়োগ করেছে।
২০১৯ সালে আইসিসির আপিল বিভাগ রায় দিয়েছিল, আদালতের সদস্য নয় এমন সুদানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে গ্রেপ্তার করা জর্ডানের দায়িত্ব ছিল। ২০২৪ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে গ্রেপ্তার না করায় মঙ্গোলিয়াও আদালতের সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে বলে রায় দেন বিচারকেরা।
তবে আইসিসির কিছু সদস্যরাষ্ট্র যুক্তি দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত দায়মুক্তির কারণে আদালতের সদস্য নয় এমন দেশের ক্ষমতাসীন নেতাকে গ্রেপ্তার করার বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের দুই ধরনের দায়মুক্তি স্বীকৃত।
ব্যক্তিগত দায়মুক্তি: রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো সীমিতসংখ্যক পদধারীকে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বিদেশি দেশের জাতীয় আদালতে গ্রেপ্তার ও বিচারের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়। অভিযোগের ধরন যা-ই হোক, এ দায়মুক্তি কার্যকর থাকতে পারে। তবে এটি সাময়িক এবং পদ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়।
কার্যগত দায়মুক্তি: সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কর্মকর্তা পদ ছাড়ার পরও এটি বহাল থাকতে পারে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মিডল ইস্ট আইকে জানিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের ক্ষেত্রে এ দায়মুক্তির ব্যতিক্রম ক্রমেই সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লে নেতানিয়াহু ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন। তখন তাঁর ক্ষেত্রে কেবল কার্যগত দায়মুক্তির প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে।
কোন কোন দেশ দায়মুক্তির যুক্তি দেখিয়েছে?
২০২৪ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স বলেছিল, আইসিসির সদস্য নয় এমন দেশের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দায়মুক্তি নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও বিবেচনায় নিতে হবে। গ্রেপ্তারের অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে জানায় দেশটি। তবে দায়মুক্তি নিয়ে কাজ করা আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি নেতানিয়াহুকে সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে দায়মুক্তির নিয়ম মেনে চলার কথা বলেন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহুর হাঙ্গেরি সফরের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার না করার ঘটনায় হাঙ্গেরিও রোম সংবিধির ৯৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দায়মুক্তির যুক্তি তুলে ধরে। পরে আইসিসি জানায়, হাঙ্গেরি আদালতের সঙ্গে সহযোগিতার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেই নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা নিশ্চিত হবে না। আইসিসির নিজস্ব কোনো পুলিশ বাহিনী নেই। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে আদালত বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল।
ইসরায়েলে নতুন সরকার চাইলে আইসিসির সঙ্গে সহযোগিতা করে নেতানিয়াহুকে আদালতের কাছে হস্তান্তর করতে পারে।
বিদেশি আদালতে কি তার বিচার হতে পারে?
পদ ছাড়লে নেতানিয়াহু ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধান হিসেবে বিদেশি দেশের কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তার ও বিচার থেকে সুরক্ষা দেওয়া ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারাবেন।
অনেক দেশের আইনে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে সর্বজনীন এখতিয়ারের বিধান রয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দেশে অপরাধ সংঘটিত না হলেও কিংবা সেই দেশের সঙ্গে ঘটনার সরাসরি কোনো যোগসূত্র না থাকলেও দেশটির আদালত বিদেশে সংঘটিত এসব অপরাধের বিচার করতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, গাজায় ত্রাণবাহী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা আটকে দেওয়ার ঘটনায় নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তুরস্ক ইতিমধ্যে নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চালাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ও ইতামার বেন গভিরও রয়েছেন। অভিযোগগুলো ২০২৫ সালে ফ্লোটিলা আটকে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
ব্যক্তিগত দায়মুক্তি হারালে এ ধরনের মামলার একটি বড় আইনি বাধা দূর হবে। তবে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় করা কাজের জন্য নেতানিয়াহু কার্যগত দায়মুক্তির দাবি জানাতে পারবেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট আদালতে প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করবে।
সাবেক নেতাদের বিরুদ্ধেও এ ধরনের আইনি পদক্ষেপের নজির রয়েছে। চিলির সাবেক শাসক অগাস্তো পিনোশেকে ১৯৯৮ সালে স্পেনের জারি করা পরোয়ানার ভিত্তিতে লন্ডনে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরের বছর যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডস রায় দেয়, প্রযোজ্য আইনি কাঠামোর আওতায় নির্দিষ্ট কিছু নির্যাতনের অভিযোগে তিনি দায়মুক্তি দাবি করতে পারবেন না।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ আদালত সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে জারি করা একটি পরোয়ানা বাতিল করে। তবে আদালত জানায়, তিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর নতুন করে পরোয়ানা জারি করা যেতে পারে। আদালত আরও বলে, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে সাবেক নেতাদের কার্যগত দায়মুক্তি সুরক্ষা দেয় না।
নেতানিয়াহুর বিদেশ সফর তাকে গ্রেপ্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে তার উপস্থিতি ছাড়াও কিছু দেশ তদন্ত করতে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে।
তাকে আটক করা অবশ্য বাস্তবিক অর্থেই কঠিন হতে পারে। গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় তিনি আন্তর্জাতিক সফর এড়িয়ে চলতে পারেন। এ ছাড়া ইসরায়েল সরকার তাকে হস্তান্তর করতে রাজি নাও হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার কী হবে?
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যার অভিযোগে মামলা করে। মামলাটি কোনো ব্যক্তির নয়, বরং রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের দায় নিয়ে। ফলে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হলে মামলাটির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না।
তবে গণহত্যার অভিপ্রায় প্রমাণের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তিনি পদ ছাড়ার পরও।
দক্ষিণ আফ্রিকার অভিযোগের জবাবে ইসরায়েল ২০২৬ সালের মার্চে পাল্টা যুক্তি জমা দিয়েছে। এর মধ্যে আদালতের এখতিয়ার নিয়ে আপত্তিও রয়েছে।
আদালত দক্ষিণ আফ্রিকাকে জবাব দেওয়ার জন্য ২০২৭ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত সময় দিয়েছে। এরপর ইসরায়েলকে জবাব দেওয়ার জন্য ২০২৯ সালের ২২ মে পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে আরও কয়েক বছর লাগতে পারে।
দুর্নীতির মামলার কী হবে?
প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেও ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির বিচার বন্ধ হবে না।
২০২০ সাল থেকে তিনটি মামলায় ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তাঁর বিচার চলছে। তবে তিনি কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে দোষ স্বীকার না করেই তিনি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এপ্রিলে প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানায়, ক্ষমার আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে দুই পক্ষের আদালতের বাইরে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করা উচিত।
বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, নেতানিয়াহু দোষ স্বীকার না করলে এবং রাজনীতি থেকে সরে না দাঁড়ালে প্রেসিডেন্ট তাঁকে ক্ষমা করতে পারবেন না।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই