Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ফুসফুসের ক্যানসার ফিরে আসার সংকেত মিলতে পারে স্ক্যানে ধরা পড়ার ১৬ মাস আগেই

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১২ পিএম

ফুসফুসের ক্যানসার ফিরে আসার সংকেত মিলতে পারে স্ক্যানে ধরা পড়ার ১৬ মাস আগেই

বিজ্ঞাপন

ফুসফুসের ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর রোগটি আবার ফিরে আসার সংকেত স্ক্যানে ধরা পড়ার অনেক আগেই শনাক্ত করতে পারে বিশেষ ধরনের রক্ত পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে ক্যানসার কোষের জিনগত উপাদান খুঁজে দেখার এই পদ্ধতি কিছু রোগীর ক্ষেত্রে প্রচলিত স্ক্যান বা রোগের লক্ষণ প্রকাশের গড়ে প্রায় ১৬ মাস আগেই ক্যানসার ফিরে আসার সংকেত দিতে পারে। তবে পরীক্ষাটি এখনো নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি।

গবেষণায় মূলত ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অস্ত্রোপচারের পর রোগটি আবার ফিরে আসার ঝুঁকি নির্ণয়ের বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়েছে। যাঁদের আগে কখনো ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়েনি, তাঁদের মধ্যে প্রথমবার রোগ শনাক্ত করার জন্য এই পরীক্ষা ব্যবহারের বিষয়টি গবেষণার লক্ষ্য ছিল না।

গবেষকেরা রক্তের নমুনায় ক্যানসার-সংশ্লিষ্ট ডিএনএ খুঁজে দেখেছেন। এ ধরনের পরীক্ষাকে বলা হয় ‘লিকুইড বায়োপসি’। এতে শরীর থেকে টিস্যু সংগ্রহের পরিবর্তে রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করে টিউমারের জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। গবেষণায় টিউমারের নিজস্ব জিনগত বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে পুরো জিনোম বিশ্লেষণের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রক্তে ছড়িয়ে থাকা টিউমারের ডিএনএ শনাক্ত করে ক্যানসার আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষক দলের সদস্য ও নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোনের চিকিৎসক মাতিজা স্নুডারেল জানান, তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুসের ক্যানসার—বিশেষ করে স্টেজ আইএ ফুসফুসের অ্যাডেনোকারসিনোমা—অস্ত্রোপচারের পরও ফিরে আসার আণবিক সংকেত রক্ত পরীক্ষায় শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। প্রচলিত স্ক্যানে রোগটি দৃশ্যমান হওয়ার আগেই অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এই সংকেত পাওয়া গেছে।

গবেষণায় ৪২ জন রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষাটি ক্যানসার ফিরে আসার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ সংবেদনশীলতা এবং ৮৩ শতাংশ নির্দিষ্টতা দেখিয়েছে। অর্থাৎ, পরবর্তী সময়ে যাঁদের ক্যানসার ফিরে এসেছিল, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশের ক্ষেত্রে পরীক্ষাটি ইতিবাচক সংকেত দিতে পেরেছে। আর যাঁদের রোগ ফিরে আসেনি, তাঁদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে পরীক্ষাটির নির্দিষ্টতা ছিল ৮৩ শতাংশ। যেসব রোগীর রক্ত পরীক্ষায় ক্যানসারের সংকেত পাওয়া গিয়েছিল এবং পরে রোগ ফিরে আসা নিশ্চিত হয়েছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে স্ক্যান বা চিকিৎসাগত লক্ষণে ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার আগে গড়ে ১৬ দশমিক ৭ মাস সময় পাওয়া গেছে।

ফুসফুসের নন-স্মল সেল ক্যানসারের ক্ষেত্রে চিকিৎসার পরও রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত হয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণ করা হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয় না। প্রচলিত চিকিৎসায় অস্ত্রোপচারের পর রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণে নিয়মিত ইমেজিং বা স্ক্যান ব্যবহার করা হয়। নতুন রক্ত পরীক্ষা এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তথ্য দিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

পরীক্ষায় রক্তে টিউমারের ডিএনএ পাওয়া গেলে তা শরীরে ক্যানসারের অবশিষ্ট কোষ থাকার বা রোগ ফিরে আসার সম্ভাব্য সংকেত হতে পারে। অন্যদিকে, পরীক্ষায় এমন ডিএনএ না পাওয়া গেলে তা দীর্ঘমেয়াদি রোগমুক্ত অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে নেতিবাচক ফলাফল মানেই শরীরে ক্যানসার নেই—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। রক্তে টিউমারের ডিএনএর পরিমাণ খুব কম হলে তা পরীক্ষায় ধরা না-ও পড়তে পারে। তাই ফলাফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়ন এবং প্রচলিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

স্নুডারেলের মতে, এ ধরনের পরীক্ষা অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের পর্যবেক্ষণে একটি কম আক্রমণাত্মক অতিরিক্ত পদ্ধতি হিসেবে কাজে আসতে পারে। যাঁদের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে আরও ঘন ঘন স্ক্যান বা অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কি না, তা নির্ধারণে চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। আবার যাঁদের ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তাঁদের অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

তবে গবেষক সতর্ক করেছেন, নিয়মিত চিকিৎসায় এই পরীক্ষা ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। বর্তমান গবেষণাটি ছিল আগের রোগীর তথ্য ও নমুনা বিশ্লেষণভিত্তিক; এতে অংশ নিয়েছেন মাত্র ৪২ জন। তাই এই ফলাফলকে এখনই সব রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিবর্তন করলে রোগীর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল সত্যিই উন্নত হয় কি না, সেটিও আরও গবেষণায় নিশ্চিত করতে হবে।

ফুসফুসের ক্যানসার গবেষণা ফাউন্ডেশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অ্যান্টোয়ানেট জে. ওজনিয়াক গবেষণাটিকে আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, স্ক্যান বা রোগের লক্ষণ প্রকাশের ১৬ মাসেরও বেশি আগে ক্যানসার ফিরে আসার পূর্বাভাস পাওয়া গেলে অস্ত্রোপচারের পর কার অতিরিক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে, তা নির্ধারণে চিকিৎসকেরা বাড়তি তথ্য পাবেন। তবে তিনি জোর দিয়েছেন, নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হিসেবে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার পর্যবেক্ষণ চালু করার আগে আরও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।

গবেষকদের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো আরও বেশি রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যৎমুখী গবেষণার মাধ্যমে ফলাফল যাচাই করা। পাশাপাশি কত সময় পরপর রক্তের নমুনা নেওয়া উচিত এবং স্ক্যান ও অন্যান্য চিকিৎসাগত তথ্যের সঙ্গে পরীক্ষার ফল কীভাবে মিলিয়ে দেখা হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।

গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে ফুসফুসের ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি আগেভাগে বুঝতে এবং রোগীভেদে চিকিৎসা পরিকল্পনা সাজাতে সহায়তা করতে পারে। তবে আপাতত এটি সম্ভাবনাময় গবেষণাপদ্ধতি—প্রচলিত স্ক্যান বা চিকিৎসকের নির্ধারিত ফলোআপের বিকল্প নয়।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার