Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ক্যালিফোর্নিয়ায় গৃহহীন প্রায় ৩৪ হাজার মানুষের রাত কাটছে গাড়িতে

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০০ পিএম

ক্যালিফোর্নিয়ায় গৃহহীন প্রায় ৩৪ হাজার মানুষের রাত কাটছে গাড়িতে

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বাড়ি ভাড়া ও আবাসন সংকটের কারণে হাজার হাজার মানুষ গাড়িকেই নিজেদের থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যটিতে প্রতিরাতে প্রায় ৩৪ হাজার গৃহহীন মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি, ভ্যান, আরভি বা অন্যান্য যানবাহনে ঘুমান। তাঁদের প্রায় অর্ধেক থাকেন আরভি, বসবাসের উপযোগী করে পরিবর্তন করা বাস কিংবা ট্রাভেল ট্রেইলারে। গত ২৫ মে প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসন সংকটের এই চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এসব যানবাহন রাস্তা থেকে সরাতে স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যালিফোর্নিয়ায় গৃহহীন মানুষের একটি বড় অংশ ফুটপাত কিংবা অস্থায়ী তাঁবুর পরিবর্তে গাড়িতে বসবাস করছেন। অনেকের কাছে এসব যানবাহনই মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়। উচ্চ বাড়িভাড়া, সীমিত আয় এবং সাশ্রয়ী আবাসনের অভাবে তাঁদের পক্ষে নিয়মিত বাসা ভাড়া নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কেউ পুরোনো আরভি কিনছেন, কেউ ভ্যান বা বাসকে থাকার উপযোগী করে তুলছেন। তবে গাড়িতে বসবাসকারী সবার পরিস্থিতি এক নয়। কারও ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট প্রধান কারণ, আবার কেউ ব্যক্তিগত পরিস্থিতি কিংবা জীবনযাপনের পছন্দের কারণে এভাবে থাকছেন।

গাড়িতে বসবাসকারী মানুষের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অধিকারকর্মীরা। স্যাক্রামেন্টোভিত্তিক গৃহহীন মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা আইনজীবী টোরি ল্যারেটের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৬৮ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। তিনি ন্যাশনাল ভেহিকল রেসিডেন্সি কোয়ালিশনের গবেষণা পরিচালক হিসেবেও কাজ করছেন। তাঁর মতে, প্রচলিত পদ্ধতিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা গণনার সময় গাড়িতে বসবাসকারী অনেকে হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারেন। তবে তাঁর দেওয়া সংখ্যাটি একটি ব্যক্তিগত অনুমান, সরকারি হিসাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য নয়।

এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন শহরে রাস্তার পাশে দীর্ঘ সময় ধরে পার্ক করে রাখা বড় যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসে আরভি সরানো, পার্কিং টিকিট দেওয়া এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রম চলছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া একটি আইনের আওতায় লস অ্যাঞ্জেলেস ও আলামেডা কাউন্টিতে নির্দিষ্ট শর্তে বড় যানবাহন অপসারণের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। যেসব যানবাহনের মূল্য সর্বোচ্চ চার হাজার ডলার এবং মালিক টো ট্রাকের সহায়তা ছাড়া সেগুলো সরাতে পারছেন না, সেসব যানবাহন দ্রুত ধ্বংস করার সুযোগও আইনে রাখা হয়েছে। আগে সংশ্লিষ্ট মূল্যসীমা ছিল ৫০০ ডলার।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কিছু আরভি ও বড় যানবাহন জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তার জন্য সমস্যা তৈরি করছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি কাউন্সিল সদস্য ট্রেসি পার্কের অভিযোগ, কিছু এলাকায় এসব যানবাহন ঘিরে অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সমস্যা রয়েছে। অন্যদিকে গৃহহীন মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর বক্তব্য, বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না করে গাড়ি সরিয়ে দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে যাঁদের গাড়ি সচল নয় কিংবা অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য নেই, তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে ৭১ বছর বয়সী ডেভিড বুনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। একসময় লিমুজিন পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকা এই ব্যক্তি লস অ্যাঞ্জেলেসের শেরম্যান ওকস এলাকায় একটি ট্রাভেল ট্রেইলারে বসবাস করছিলেন। আগে তিনি একটি অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। কিন্তু ভবনটি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনার কারণে তাঁকে সেখান থেকে সরে যেতে হয়। এলাকায় মাসিক বাড়িভাড়া দুই হাজার ডলারের বেশি হওয়ায় সীমিত আয়ে নতুন বাসা নেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৬ হাজার ডলারে একটি ব্যবহৃত ট্রেইলার কেনেন। তবে সেটি কোথায় এবং কতদিন পার্ক করে রাখা যাবে, তা নিয়েও তাঁকে অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়েছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসে গাড়িতে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে গবেষণা করছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের সমাজবিজ্ঞানের গবেষক স্যাম লুটজকার। তাঁর গবেষণায় প্রায় ৯০ জনের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, অনিরাপদ বা জরাজীর্ণ আরভিতে বসবাসের কারণে বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর মতে, শুধু পার্কিং টিকিট দেওয়া, গাড়ি জব্দ করা কিংবা ধ্বংস করার মাধ্যমে গৃহহীনতার মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত সামাজিক সহায়তা ও বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না থাকলে এসব পদক্ষেপে দুর্বল অবস্থায় থাকা মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর মধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়ায় সামগ্রিক গৃহহীনতার হার কিছুটা কমার তথ্য জানিয়েছে রাজ্য সরকার। ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রাথমিক সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রাজ্যজুড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে বসবাসকারী গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় আনুমানিক ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই হ্রাস প্রায় ১২ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে এই পরিসংখ্যান সামগ্রিক গৃহহীন পরিস্থিতির, শুধু গাড়িতে বসবাসকারীদের নয়। ফলে গাড়িতে থাকা ৩৪ হাজার মানুষের আগের অনুমান থেকে বর্তমানে সংখ্যাটি কতটা বদলেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

ক্যালিফোর্নিয়া সরকার গৃহহীনতা কমাতে আবাসন, অস্থায়ী আশ্রয় এবং বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় করছে। তবে সাশ্রয়ী বাসার সংকট এবং নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন ব্যয় বহনের সক্ষমতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্ট অধিকারকর্মীরা মনে করছেন, রাস্তা থেকে আরভি সরানোর পাশাপাশি স্থায়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। কারণ অনেকের কাছে একটি পুরোনো গাড়ি শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং সেটিই তাঁদের একমাত্র থাকার জায়গা।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার