বিজ্ঞাপন
ককপিটে ঘুমিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা ৭৭ শতাংশ পাইলটের, ক্লান্তি নিয়েও উড়ছেন অনেকে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
বিজ্ঞাপন
বিমান চালানোর সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে কয়েক মুহূর্তের জন্য ঘুমিয়ে পড়া বা জেগে থাকতে তীব্র লড়াই করার অভিজ্ঞতা হয়েছে ইউরোপের ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ পাইলটের। ইউরোপের ৩২টি দেশের প্রায় ৭ হাজার ২০০ পাইলটের ওপর পরিচালিত এক জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য। ২০২৬ সালের আগস্টে পরিচালিত এই জরিপের ফলাফল বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এবং ক্লান্তি নিয়েও ফ্লাইট পরিচালনা করার প্রবণতা যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
নিউইয়র্ক পোস্টের ২৮ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। ইউরোপীয় ককপিট অ্যাসোসিয়েশনের (ইসিএ) উদ্যোগে পরিচালিত জরিপটি বিশ্লেষণ করেছে বিমান চলাচলবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইনস সিমন্স।
জরিপ অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী পাইলটদের ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ জানিয়েছেন, আগের চার সপ্তাহে উড়োজাহাজ পরিচালনার সময় অন্তত একবার অনিচ্ছাকৃতভাবে কয়েক মুহূর্তের জন্য ঘুমিয়ে পড়া কিংবা জেগে থাকতে গুরুতর সমস্যার মুখে পড়েছেন। এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘মাইক্রোস্লিপ’। এতে অল্প সময়ের জন্য অনিচ্ছাকৃত ঘুম চলে আসতে পারে, যা পাইলটের মনোযোগ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ পাইলট সাধারণত বা প্রায়ই পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ পান না বলে জানিয়েছেন। ফলে এক ফ্লাইটের পর আরেক ফ্লাইট পরিচালনার সময় জমতে থাকা ক্লান্তি থেকে পুরোপুরি সেরে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ক্লান্তির কারণে নিরাপদে ফ্লাইট পরিচালনার উপযুক্ত মনে না করলেও অনেক পাইলট তা কর্তৃপক্ষকে জানাতে চান না। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২৪ দশমিক ২ শতাংশ জানিয়েছেন, ক্লান্তি অনুভব করলেও সাধারণত তাঁরা নিজেদের ফ্লাইট পরিচালনার অনুপযুক্ত ঘোষণা না করে কাজ চালিয়ে যান।
ক্লান্তির বিষয়টি জানালে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। প্রায় ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ পাইলট আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, ক্লান্তির কথা জানালে তাঁদের শাস্তি বা প্রতিশোধমূলক আচরণের মুখে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে, ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ পাইলট অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন বা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জরিপে ‘কমান্ডারস ডিসক্রিশন’ ব্যবস্থার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থার আওতায় ক্যাপ্টেন নির্ধারিত সীমার বাইরে ফ্লাইট ডিউটির সময় বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারেন। জরিপে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ পাইলট জানিয়েছেন, আগের চার সপ্তাহে তাঁরা অন্তত একবার এ সুবিধা ব্যবহার করেছেন।
ইসিএর মতে, ফ্লাইটের বিলম্ব পুষিয়ে নেওয়া কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের চাপ পাইলটদের ক্লান্তি বাড়াতে পারে। তাই শুধু ফ্লাইট ডিউটির সময়সীমা নির্ধারণ করলেই হবে না, পাইলটরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছেন কি না এবং ক্লান্তির কথা নির্ভয়ে জানাতে পারছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে জরিপের ফলাফলকে সব ইউরোপীয় পাইলটের অভিজ্ঞতার সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে দেখা যাবে না। এটি অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ফলে পরিসংখ্যানগুলো জরিপে অংশ নেওয়া পাইলটদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে, সব ফ্লাইটে পাইলট ঘুমিয়ে পড়ছেন এমন প্রমাণ দেয় না।
বিমান চলাচলে পাইলটের ক্লান্তি নতুন সমস্যা নয়। দীর্ঘ সময় কাজ, রাতের ফ্লাইট, অনিয়মিত কর্মসূচি এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব শারীরিক ও মানসিক সতর্কতা কমিয়ে দিতে পারে। ককপিটে মনোযোগ ধরে রাখা, পরিস্থিতি দ্রুত মূল্যায়ন করা এবং জরুরি অবস্থায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্লান্তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইউরোপীয় ককপিট অ্যাসোসিয়েশন বিমান সংস্থাগুলোর ক্লান্তি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি এমন কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে পাইলটরা শাস্তি বা চাকরিগত ক্ষতির আশঙ্কা ছাড়াই নিজেদের শারীরিক অবস্থার কথা জানাতে পারবেন।
জরিপের ফলাফল আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, আকাশপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আধুনিক উড়োজাহাজ ও প্রযুক্তির পাশাপাশি পাইলটদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বাস্তবসম্মত কর্মসূচি এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।