বিজ্ঞাপন
অর্থনৈতিক মন্দাকেও ছাড়াল দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসন সংকট, তলানিতে বাড়ি কেনাবেচা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪০ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ি কেনাবেচা এমন পর্যায়ে নেমেছে, যা ২০০৮ সালের মহামন্দার সময়কার সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। অঞ্চলটির ছয়টি কাউন্টিতে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা ১২ মাসে বাড়ি বিক্রির সংখ্যা ২০০৫ সাল থেকে হিসাব করা বার্ষিক গড়ের তুলনায় ৩৩ শতাংশ কম ছিল। তবে বিক্রি কমলেও বাড়ির দাম এখনো রেকর্ডের কাছাকাছি। ফলে উচ্চমূল্য, ঋণের সুদ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতার জন্য বাড়ির মালিক হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
আবাসনবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাটমের সংশোধিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে লস অ্যাঞ্জেলেস ডেইলি নিউজের ব্যবসাবিষয়ক কলাম লেখক জনাথন ল্যান্সনার এ চিত্র তুলে ধরেছেন। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে বাড়ি বিক্রির সবচেয়ে ধীর সময়গুলোর একটি চলছে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায়। তাঁর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই মাসে বাড়ি বিক্রির গতি ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের আবাসন বাজারের ধসের সবচেয়ে খারাপ সময়ের তুলনায়ও প্রায় ৩ শতাংশ কম ছিল। সংশোধিত হিসাবে আগে থেকে বিদ্যমান বাড়ির পাশাপাশি নতুন নির্মিত বাড়ি ও কনডোর বিক্রিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও উদ্বেগজনক। গত ২১ বছরে যে ২৫টি মাসে বাড়ি বিক্রি সবচেয়ে কম ছিল, তার মধ্যে ১৭টি মাসই এসেছে ২০২৩ সালের পর। ২০০৭ ও ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় এমন সাতটি মাস ছিল। আরেকটি ছিল ২০২০ সালের মে মাস, যখন করোনাভাইরাস মহামারির বিধিনিষেধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ থমকে গিয়েছিল। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাড়ি কেনাবেচার দুর্বলতা শুধু সাময়িক ওঠানামায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিক্রি কমলেও বাড়ির দাম ক্রেতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ির মধ্যম দাম ছিল ৮ লাখ ১৫ হাজার ডলার, যা অঞ্চলটির ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ। সর্বোচ্চ দামের তুলনায় এটি মাত্র ২ শতাংশ কম। ফলে বাজারে বাড়ি কেনার আগ্রহ থাকলেও অনেক পরিবার আর্থিক সামর্থ্যের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। উচ্চ বন্ধকি ঋণের সুদ, সম্পত্তিকর, বাড়ির বিমা এবং অর্থনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রেতাদের বাড়ি কেনার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে বাধ্য করছে।
ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের বসন্তে অরেঞ্জ কাউন্টিতে মাত্র ১৫ শতাংশ পরিবার একটি বাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখত। লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগো কাউন্টিতে এ হার ছিল ১৭ শতাংশ, ভেনচুরায় ১৯ শতাংশ, রিভারসাইডে ২৮ শতাংশ এবং সান বার্নার্ডিনোতে ৩৪ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান দেখায়, অঞ্চলটির অধিকাংশ পরিবারের জন্য বাড়ির মালিক হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে প্রথমবার বাড়ি কিনতে আগ্রহীদের জন্য প্রয়োজনীয় অগ্রিম অর্থ জোগাড় করা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাড়ির দাম বাড়ার গতিও আগের তুলনায় কমেছে। ২০২৩ সালের পর থেকে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ির মূল্য বছরে গড়ে প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে এর আগের দশকে বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৭ শতাংশ। দাম বৃদ্ধির গতি কমে আসায় দ্রুত মুনাফার আশায় বাড়ি কেনার প্রবণতাও দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্যে বাড়ি কেনার পর ঋণের কিস্তি বহন করার ঝুঁকি ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ফলে বাড়ির দাম স্থিতিশীল থাকলেও বাজারে লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রে তা যথেষ্ট সহায়ক হচ্ছে না।
মধ্যম দামের একটি বাড়ি কিনলে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একজন ক্রেতাকে বন্ধকি ঋণের কিস্তি, সম্পত্তিকর, বাড়ির বিমা ও বন্ধকি ঋণবিমাসহ প্রতি মাসে আনুমানিক ৫ হাজার ৭৬৫ ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। পাঁচ বছর আগের তুলনায় এই মাসিক ব্যয় ৭২ শতাংশ বেশি। এর বাইরে ১০ শতাংশ অগ্রিম অর্থ হিসেবে প্রয়োজন প্রায় ৮১ হাজার ৫০০ ডলার। বিপরীতে, জিলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে অঞ্চলটিতে বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্টের গড় মাসিক ভাড়া ছিল প্রায় ২ হাজার ৮৬০ ডলার, যা বাড়ি কেনার আনুমানিক মাসিক ব্যয়ের অর্ধেকেরও কম।
বন্ধকি ঋণের সুদের হার বাড়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ৩০ বছর মেয়াদি নির্দিষ্ট সুদের বন্ধকি ঋণের গড় হার ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অক্টোবরের মাঝামাঝি তা বেড়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছায়। এই বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য ক্রেতাদের বাড়ি কেনার আর্থিক সক্ষমতা আনুমানিক ৮ শতাংশ কমে গেছে। ফলে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসন বাজারে বিক্রি বাড়াতে শুধু দাম কমার অপেক্ষা যথেষ্ট নয়, ঋণের খরচ ও ক্রেতাদের সামর্থ্যও বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: লস অ্যাঞ্জেলেস ডেইলি নিউজ, অ্যাটম, ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব রিয়েলটরস ও জিলো।