বিজ্ঞাপন
সৌরজগতে মিলল এক বিশাল ‘রহস্যময় গ্রহ’!
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪১ এএম
বিজ্ঞাপন
সৌরজগতে প্লুটোর কক্ষপথের বাইরে নতুন একটি ‘বামন গ্রহের’ (Dwarf Planet) সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সাময়িকভাবে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইডি১৩৮’ (ED138)। ভবিষ্যতে পর্যবেক্ষণে এটি নিশ্চিত হলে এটি আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (আইএইউ) কর্তৃক স্বীকৃত পাঁচটি বামন গ্রহের (সেরেস, প্লুটো, হাউমেয়া, মেকমেকে ও এরিস) দলে যুক্ত হবে। খবর সিএনএন।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির একটি ৮,৮০০ ফুট (২,৬৮২ মিটার) উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত ‘ভেরা সি. রুবিন অবজারভেটরি’র নতুন টেলিস্কোপের সাহায্যে এটি সনাক্ত করা হয়। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডিজিটাল ক্যামেরা সম্বলিত এই টেলিস্কোপটি ২০২৫ সাল থেকে কাজ শুরু করে এবং প্রতি তিন দিনে সমগ্র আকাশের ছবি তুলতে সক্ষম।
স্মিথসোনিয়ানের সিনিয়র অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের লেকচারার ম্যাথিউ হোলম্যানের যৌথভাবে প্রস্তুতকৃত একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে রুবিন অবজারভেটরির সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। বিলিয়ন বিলিয়ন গতিশীল বস্তুর তথ্যের মধ্য থেকে ‘ইডি১৩৮’ ভেসে উঠলে হোলম্যানের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়কর ও অবিশ্বাস্য। ভুল বা কোনো কম্পিউটার বিভ্রাট কি না তা যাচাই করতে তিনি অবিলম্বে তথ্যগুলো পরীক্ষা করেন।
পরবর্তীতে এটি নিশ্চিত করতে রুবিন অপারেশন্স টিমের সদস্য হোলম্যান যোগাযোগ করেন তাঁর সহকর্মী মারিও জুরিকের সঙ্গে। জুরিক ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং রুবিনের সৌরজগৎবিষয়ক প্রধান বিজ্ঞানী। জুরিক রুবিনের ডাটাবেজে ইডি১৩৮-এর আরও ২০টি পুরোনো পর্যবেক্ষণ পান, যেগুলো ২০২৬ সালের মার্চ মাসের। অন্যান্য উৎস ব্যবহার করে গবেষকরা গত ১০ বছর আগের সময় পর্যন্ত বস্তুটির কক্ষপথ আঁকতে সক্ষম হন।
তবে হোলম্যান সতর্ক করে বলেছেন, ইডি১৩৮ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বামন গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। এটি এখনো একটি 'প্রার্থী' বা সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। এটি বাস্তবে ঠিক কতটা বড়, তা নিশ্চিত হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
যেমন ইডি১৩৮ (ED138)
ইডি১৩৮-এর ব্যাস আনুমানিক ৬০০ থেকে ১,৫০০ কিলোমিটার (৩৭০ থেকে ৯৩০ মাইল) হতে পারে। এর ফলে এটি এ যাবৎ স্বীকৃত সবচেয়ে ছোট বামন গ্রহ ‘সেরেস’-এর চেয়েও বড় হবে। এটি বর্তমানে সূর্য থেকে প্রায় ৪৬ অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিট (AU) দূরত্বে অবস্থান করছে (পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বকে ১ AU ধরা হয়)। এর অর্থ হলো, ইডি১৩৮ প্লুটোর চেয়েও দূরে এবং এটি একটি ‘ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অবজেক্ট’ (TNO)—অর্থাৎ নেপচুনের কক্ষপথের বাইরে সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী মহাজাগতিক বস্তু।
রাতের আকাশে এটি খালি চোখে দেখা যায় না। তবে হোলম্যান জানান, অভিজ্ঞ শৌখিন পর্যবেক্ষকরা যদি সঠিক দিক জানেন, তবে বেশ দক্ষ টেলিস্কোপ দিয়ে এটি দেখতে পাবেন।
এতদিন ইডি১৩৮ আবিষ্কৃত না হওয়ার অন্যতম কারণ এটি দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত। ফলে উত্তর গোলার্ধ থেকে এটি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। হোলম্যানের মতে, এই অঞ্চলের আকাশে অনুসন্ধান চালানোর মতো বেশি টেলিস্কোপ ছিল না। এছাড়া বিগত ২০ বছর ধরে আমাদের পর্যবেক্ষণ দৃষ্টিকোণ থেকে বস্তুটি মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথের একই সমতলে অবস্থান করছিল। তারা দিয়ে পূর্ণ ছায়াপথের ভিড়ে চলমান বস্তু খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত জটিল হওয়ায় সচরাচর এই অঞ্চলে অনুসন্ধান চালানো হয় না।
রুবিন টেলিস্কোপের আবিষ্কৃত তালিকার মধ্যে বেশিরভাগই গ্রহাণু ও অপেক্ষাকৃত ছোট টিএনও। তবে হোলম্যান বিশ্বাস করেন, ইডি১৩৮-এর আকারের আরও কয়েকটি বস্তু থাকতে পারে যা রুবিন টেলিস্কোপ ভবিষ্যতে খুঁজে বের করবে।
কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের রিডার এবং রুবিন সোলার সিস্টেম অপারেশন্স টিমের সদস্য মেগান সোয়াম্ব জানান, প্রাথমিক পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণের এত শুরুতেই এমন একটি বস্তু খুঁজে পাওয়া সারপ্রাইজিং বা আশ্চর্যজনক ছিল। এটি প্রমাণ করে যে রুবিনের গতি, গভীরতা এবং মহাকাশ পরিধির সমন্বয় কীভাবে আগামী দশকে সৌরজগৎ সম্পর্কে আমাদের ধারণা বদলে দেবে।
একটি নতুন পৃথিবীর ভাবনা
২০০৬ সালে আইএইউ গ্রহের নতুন সংজ্ঞা গ্রহণ করে। এতে বলা হয়— একটি গ্রহকে অবশ্যই সূর্যের চারপাশে ঘুরতে হবে, প্রায় গোলাকার হতে হবে এবং এর কক্ষপথ থেকে সমআকারের অন্য বস্তুগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট বড় হতে হবে। শেষ শর্তটি পূরণ না করায় তখন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, ফলে সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা ৯ থেকে ৮টিতে নেমে আসে। সে সময় প্লুটো ও এর সমগোত্রীয় গোলকাকার বস্তুগুলোকে ‘বামন গ্রহ’ বলা শুরু হয়।
যদি ইডি১৩৮ নতুন বামন গ্রহ হিসেবে নিশ্চিত হয়, তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমে এটিকে একটি স্থায়ী নম্বর এবং পরে মূল নাম দেবেন। তবে এই প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।
নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মিশেল ব্যানিস্টার (যিনি ইডি১৩৮ আবিষ্কারে যুক্ত ছিলেন না) বলেন, এটি বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি আবিষ্কার। মহাজাগতিক স্কেলে এর আকার এটিকে একটি ‘বিশ্ব’ বা ‘নতুন পৃথিবী’ হিসেবে চিন্তা করার সুযোগ দেয়।
তিনি যোগ করেন, ভবিষ্যতে যদি কখনো কোনো স্পেসক্রাফট বা মহাকাশযান সেখানে পাঠানো যায়, তবে হয়তো সেখানে প্লুটোর মতো নাইট্রোজেনের হিমবাহ দেখা যেতে পারে। তবে আপাতত কেবল এটুকুই নিশ্চিত যে এটি আকারে বড়, বাকি বৈশিষ্ট্য জানতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।