বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতন্ত্র নিয়ে বাড়ছে ভোটারদের উদ্বেগ, নতুন জরিপে ডেমোক্র্যাটদের জন্য সতর্কবার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪০ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের দোদুল্যমান ভোটারদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগঠন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা বা ডিএসএ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে নতুন এক জরিপে। রিপাবলিকানপন্থী মুক্তবাজার অর্থনীতির সমর্থক সংগঠন আমেরিকানস ফর প্রসপারিটির (এএফপি) জরিপ অনুযায়ী, ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা ডিএসএ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। সেপ্টেম্বরে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রায় ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে অতিবামপন্থীদের প্রভাব রয়েছে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে আলাস্কা, আইওয়া, মিশিগান, মন্টানা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহাইও এবং উইসকনসিনে ভোটারদের মতামত সংগ্রহ করেছে আমেরিকানস ফর প্রসপারিটি। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১৬ অক্টোবরের মধ্যে এসব রাজ্যের ৮১ হাজার ৬৭৩ জন ভোটারের সঙ্গে সরাসরি কথোপকথন হয়েছে। তবে এটি প্রচলিত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত জাতীয় জনমত জরিপ নয়। তাই ফলাফলকে যুক্তরাষ্ট্রের সব ভোটারের মতামতের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের কাছে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং সরকারের ভূমিকা সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মুক্তবাজারভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তুলনামূলকভাবে কম সমর্থন পাওয়া গেছে। একই সময়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে অতিবামপন্থীদের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা উত্তরদাতার হার সেপ্টেম্বরে প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে অক্টোবরে প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। এএফপির দাবি, এসব তথ্য সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ভোটারের উদ্বেগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে সমাজতন্ত্র নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব বাড়ার অর্থ এই নয় যে ভোটাররা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে রিপাবলিকান পার্টির ওপর বেশি আস্থা রাখছেন। বরং একই জরিপে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। উত্তরদাতাদের ৪৫ শতাংশ মনে করেন, ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ। আর ১৮ শতাংশ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাঁরা কোনো দলকেই বিশ্বাস করেন না। আগস্টে এএফপির আগের জরিপে রিপাবলিকানরা ৪৪ শতাংশ এবং ডেমোক্র্যাটরা ৩৯ শতাংশ সমর্থন পেয়েছিল। অর্থাৎ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের আস্থার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
আমেরিকানস ফর প্রসপারিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট কেটলিন ব্লেডসো নিউইয়র্ক পোস্টকে জানিয়েছেন, সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রতি ভোটারদের সংশয় রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করলেই যে ভোটারদের সমর্থন পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রিপাবলিকান প্রার্থীদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা তুলে ধরতে হবে। সংস্থাটি ইতিমধ্যে সমাজতান্ত্রিক নীতির বিরোধিতায় জাতীয় পর্যায়ে প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে এএফপি নিজেই একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত অবস্থানসম্পন্ন সংগঠন হওয়ায় তার জরিপের ফলাফল ও ব্যাখ্যা সেই প্রেক্ষাপটেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেড়েছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজ এই রাজনৈতিক ধারার পরিচিত মুখ। ডিএসএ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সাশ্রয়ী আবাসন, শ্রমিকদের অধিকার বৃদ্ধি এবং ধনীদের ওপর বেশি কর আরোপের মতো নীতির পক্ষে অবস্থান নেয়। সংগঠনটির সমর্থকেরা এসব উদ্যোগকে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর উপায় হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এসব নীতি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ডিএসএ একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর সব নীতি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।
সমাজতন্ত্র নিয়ে ভোটারদের মনোভাব যে একমুখী নয়, তা অন্য জরিপেও উঠে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভোটারদের ৫১ শতাংশ সমাজতন্ত্র সম্পর্কে নেতিবাচক এবং ৩১ শতাংশ ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তবে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভোটারদের মধ্যে ৫৫ শতাংশ সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। অন্যদিকে ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক সমর্থক ডিএসএর পরিচয়ের চেয়ে সংগঠনটির প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক নীতির প্রতি বেশি আগ্রহী। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় এবং নির্দিষ্ট নীতির প্রতি সমর্থনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
এদিকে ৮ অক্টোবর প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের জাতীয় জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছেন ৪৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার, বিপরীতে রিপাবলিকানদের সমর্থন ছিল ৩৬ শতাংশ। এই তথ্যের সঙ্গে এএফপির নতুন জরিপ মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সমাজতন্ত্র নিয়ে কিছু ভোটারের উদ্বেগ থাকলেও তা সরাসরি কোনো একটি দলের প্রতি নির্বাচনী সমর্থনে রূপ নিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে এসব অর্থনৈতিক উদ্বেগের পাশাপাশি রাজনৈতিক মতাদর্শ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট হবে।