Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

নেতানিয়াহুর বিদায়ের দাবিতে তেল আবিবে হাজারো মানুষ

নির্বাচনের আগে চাপে ইসরায়েল সরকার

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৩ পিএম

নেতানিয়াহুর বিদায়ের দাবিতে তেল আবিবে হাজারো মানুষ

বিজ্ঞাপন

ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। শনিবার, ২৪ অক্টোবর, দেশটির তেল আবিব শহরে অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভে সরকারের পরিবর্তন, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার সময় নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানানো হয়। আগামী মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে নির্বাচনের আগে এই সমাবেশ ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিক্ষোভের আয়োজন করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় নিহত ও জিম্মি হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গঠিত অক্টোবর কাউন্সিল। সংগঠনটির দাবি, ওই হামলার আগে ও সময় নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের ত্রুটি ছিল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।

বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা শহরের রবিন চত্বর থেকে জিম্মিদের স্মরণে পরিচিত হোস্টেজেস চত্বরের দিকে মিছিল করেন। সমাবেশে বিরোধী রাজনীতিকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষ অংশ নেন। তাদের বক্তব্যে সরকারের নীতির সমালোচনা, নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি এবং দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা উঠে আসে।

বিক্ষোভে ইসরায়েলের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নেতাদের উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটও সমাবেশে যোগ দেন। নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন হিসেবে তাঁকে ঘিরে বিরোধী শিবিরের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে নির্বাচনের পর কোন দল বা জোট সরকার গঠন করতে পারবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন। ওই দিন হামাসের নেতৃত্বে গাজা থেকে ইসরায়েলে হামলা চালানো হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত হন এবং বহু মানুষকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রস্তুতি, গোয়েন্দা তথ্য মূল্যায়ন এবং সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে দেশটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে।

সমালোচকদের বক্তব্য, এত বড় নিরাপত্তা বিপর্যয় কীভাবে ঘটল এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি না, তা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। নিহত ও জিম্মি ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রশাসনিক ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়; ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হবে।

তবে নেতানিয়াহুর সরকার স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবিতে সম্মতি দেয়নি। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের প্রস্তাবিত বিকল্প ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী আইনপ্রণেতারা সমানসংখ্যক সদস্য মনোনয়ন দিতে পারবেন। বিরোধী নেতাদের একাংশের আপত্তি হলো, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মনোনয়নে গঠিত কমিশন তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। এ কারণে তাঁরা প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় অংশ না নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।

নির্বাচনের আগে জনমত জরিপও রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতা তুলে ধরছে। ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান প্রকাশিত একটি জরিপে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন শিবিরের জন্য ৫২টি এবং নেতানিয়াহুর শিবিরের জন্য ৫০টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। দেশটির সংসদে মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য সাধারণত অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে কোনো পক্ষ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ছোট দলগুলোর সমর্থন ও জোটের সমীকরণ সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে জরিপকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ভোটারদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত, ছোট দলগুলোর প্রাপ্ত ভোট এবং নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমঝোতা ফলাফল বদলে দিতে পারে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জনমত জরিপ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় সর্বশেষ প্রকাশিত জরিপগুলোই বর্তমানে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন নেতানিয়াহু। বিভিন্ন মেয়াদ মিলিয়ে তিনি প্রায় ১৯ বছর দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথমবার এবং ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর ২০২২ সালের শেষ দিকে তিনি আবার সরকারপ্রধান হন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে চলমান বিচার, বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ, গাজা যুদ্ধ পরিচালনা এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা নিয়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনাও অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এবং রাজনৈতিক সমালোচনাকে অবশ্য আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

এবারের নির্বাচনে শুধু সরকার পরিবর্তনের প্রশ্নই নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা, যুদ্ধনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিরোধী শিবিরের সমর্থকেরা মনে করেন, নেতৃত্বে পরিবর্তন এলে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি বাড়তে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাঁর অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

শনিবারের বিক্ষোভে পুলিশের পক্ষ থেকে একটি হামলার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতা নাফতালি বেনেটের নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে। তবে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে পুরো সমাবেশের পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি এবং ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহির প্রশ্ন ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে পারে, কিন্তু তদন্তের পরিধি, কমিশনের নিরপেক্ষতা এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক সহজে শেষ হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

তেল আবিবের এই সমাবেশ নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। মঙ্গলবারের ভোটে জনগণ কোন নেতৃত্বকে বেছে নেবে এবং নতুন সরকার গঠনের জন্য কোন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে, তার ওপর ইসরায়েলের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার