বিজ্ঞাপন
কানাডায় বাংলাদেশি নারীকে পাচার ও ধর্ষণের দায়ে দুই বাংলাদেশির কারাদণ্ড
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯ এএম
বিজ্ঞাপন
কানাডায় এক বাংলাদেশি নারীকে মানবপাচার ও শ্রম শোষণের দায়ে দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ মালিককে কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। তাঁদের একজন ওই নারীকে একাধিকবার ধর্ষণের দায়েও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সাসকাচুয়ান প্রদেশের সাসকাটুনের আদালতে মোহাম্মদ মাসুমকে (৪৫) ১৪ বছর এবং সোহেল হায়দারকে (৫৫) চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, দুজনকে ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরিও পরিশোধ করতে হবে।
কানাডার সংবাদমাধ্যম সিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যাওয়ার পর ওই নারী দুই ব্যক্তির পরিচালিত রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেখানে তাঁকে দীর্ঘ সময় কাজ করিয়ে যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে দেওয়া এবং পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো। আদালতের বিচারে মানবপাচার ও শ্রম শোষণের পাশাপাশি মাসুমের বিরুদ্ধে একাধিকবার ধর্ষণের অপরাধও প্রমাণিত হয়েছে।
আদালতের রায় অনুযায়ী, মোহাম্মদ মাসুমকে মানবপাচার ও একাধিকবার ধর্ষণের দায়ে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীকে বকেয়া মজুরি বাবদ ১২ হাজার ২৬৮ কানাডিয়ান ডলার পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মানবপাচারে জড়িত থাকার দায়ে সোহেল হায়দারকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁকেও ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরি বাবদ ৫ হাজার ৮৮৫ কানাডিয়ান ডলার পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। এই অর্থ কারাদণ্ডের বাইরে ভুক্তভোগীর পাওনা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সাসকাচুয়ানের গ্যাল লেক, টিসডেল ও এলরোজ এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে ওই নারীকে কাজ করানো হতো। প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হলেও তিনি নিয়মিত মজুরি পেতেন না। সপ্তাহের সাত দিনই তাঁকে কাজ করতে হতো বলে আদালতে উঠে এসেছে। থাকার জন্য দেওয়া হয়েছিল একটি অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে বেজমেন্ট। কর্মসংস্থান ও অভিবাসনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে তাঁর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
মামলার বিচারে উঠে আসে, মাসুম ওই নারীর পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেন। পাসপোর্ট ফেরত দেওয়ার শর্ত হিসেবে তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের দাবি করা হয়। আদালতে প্রমাণিত হয়, ওই নারী অন্তত আটবার ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। চাকরি হারানো, অভিবাসনসংক্রান্ত সমস্যায় পড়া এবং পুলিশের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় তাঁর পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছিল। বিচারিক প্রক্রিয়ায় এসব ঘটনাকে মানবপাচার ও যৌন শোষণের গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাজা ঘোষণার সময় ভুক্তভোগী নারীর লিখিত বক্তব্য আদালতে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে তিনি জানান, কানাডায় তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মানসিক প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। অন্য মানুষকে বিশ্বাস করতে তাঁর কষ্ট হয় এবং তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ ও পরিবারের ওপর এই অপরাধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, অপরাধীদের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া তাঁর জন্য সহজ হয়নি।
ভুক্তভোগী নারী আরও জানান, বাংলাদেশে তাঁর এলাকায় ঘটনাটি নিয়ে নানা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। এতে পরিবারের সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। বিশেষ করে ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আদালতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি নিজের স্বপ্ন, পেশাগত জীবন এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর অপরাধের প্রভাব তুলে ধরেন। যৌন সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় সুরক্ষার বিধান অনুযায়ী তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
২০২৩ সালে স্থানীয় দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও একজন অভিবাসনকর্মীর সহায়তায় ওই নারী শোষণমূলক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে একই বছরের জুলাইয়ে কানাডার পুলিশ মাসুম ও হায়দারকে গ্রেপ্তার করে। এরপর মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলে। সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার পর আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দেন এবং বৃহস্পতিবার সাজা ঘোষণা করেন।
কানাডায় অস্থায়ী ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করতে যাওয়া বিদেশি কর্মীদের জন্য এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো কর্মীর অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থান, পাসপোর্ট কিংবা চাকরি হারানোর ভয়কে ব্যবহার করে তাঁকে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করানো মানবপাচার ও শ্রম শোষণের মতো অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। নিয়োগকর্তার কাছে পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে কাজ করানোর ঘটনাও গুরুতর আইনি প্রশ্ন তৈরি করে। তবে প্রতিটি অভিযোগের আইনি মূল্যায়ন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ও পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর বহু মানুষ কাজের উদ্দেশ্যে কানাডায় যান। তাঁদের কেউ কেউ নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীল ওয়ার্ক পারমিটের আওতায় কাজ করেন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কর্মীদের অধিকার, বেতন, কাজের সময় এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। কানাডায় কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন বা মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সরকারি সহায়তা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মীদের জন্য ওপেন ওয়ার্ক পারমিটের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে এসব সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও আবেদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
সাসকাচুয়ানের এই মামলায় দুই বাংলাদেশির কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরি পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রায়ে মানবপাচার, শ্রম শোষণ ও যৌন সহিংসতার অপরাধের বিচারিক পরিণতি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত অভিবাসীদের নিরাপত্তা এবং নিয়োগকর্তার ক্ষমতার অপব্যবহার প্রতিরোধের বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
SOURCE - সিবিসি নিউজ