বিজ্ঞাপন
ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোট জালিয়াতির অভিযোগে ২৮ গ্রিন কার্ডধারী বিপাকে, নাগরিকত্বও অনিশ্চিত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৪ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোটার নিবন্ধন ও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগে ২৮ জন গ্রিন কার্ডধারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্তদের অধিকাংশই মার্কিন নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে নাগরিক না হয়েও ভোটার হিসেবে নিবন্ধন, ভোট দেওয়া অথবা নাগরিকত্বের আবেদনে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কয়েকজনের দীর্ঘ কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁদের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং পরিস্থিতিভেদে ডিপোর্টেশনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তবে এখনো কাউকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (১৯ অক্টোবর) ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে অপারেশন প্রটেক্ট দ্য ভোট। বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ২৮ জনই যুক্তরাষ্ট্রের বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বা গ্রিন কার্ডধারী। তাঁদের কেউ কয়েক বছর, আবার কেউ কয়েক দশক ধরে দেশটিতে বসবাস করছেন। তবে গ্রিন কার্ড থাকার অর্থ মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার সাধারণভাবে শুধু মার্কিন নাগরিকদের রয়েছে।
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে নাগরিক না হয়েও ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। অন্য ২২ জনের বিরুদ্ধে নাগরিকত্বের আবেদন, সাক্ষাৎকার অথবা ভোটার নিবন্ধনসংক্রান্ত নথিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়াসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও সম্ভাব্য সাজা এক নয়।
অভিযুক্তদের একজন ৪২ বছর বয়সী হোসে আন্তোনিও বানুয়েলোস-দিয়াজ। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের পুরো সময় বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তিনি মার্কিন নাগরিকত্বের আবেদন করেন। ফেডারেল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২০০৭ সালে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় তিনি নিজেকে মার্কিন নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। পরে নাগরিকত্বের আবেদনেও এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দেননি। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়নি।
বানুয়েলোস-দিয়াজ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ভোটার হিসেবে তাঁর নাম নিবন্ধিত হয়েছিল, এমন তথ্য তিনি জানতেন না। ২০০৭ সালের দিকে ড্রাইভার লাইসেন্স নেওয়ার কথা তাঁর মনে আছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ড্রাইভার লাইসেন্সের আবেদন বা নবায়নের সময় ভোটার নিবন্ধনের সুযোগ থাকে। তাঁর দাবি, তিনি কখনো ভোট দেননি, কারণ তিনি জানতেন যে মার্কিন নাগরিক না হলে ভোট দেওয়া যায় না। সোমবার লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজের বাড়ির বাইরে থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মুক্তি পেলেও অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
আরেকটি ঘটনায় ফিলিপাইনের নাগরিক ৫৬ বছর বয়সী পামেলে আরবুয়েস লাইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর সান ডিয়েগোতে নাগরিকত্বের সাক্ষাৎকার শেষ হওয়ার পরপরই হোমল্যান্ড সিকিউরিটির কর্মকর্তারা তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। আদালতের নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি একাধিকবার ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন এবং কয়েকটি নির্বাচনে ব্যালট জমা দিয়েছিলেন। অথচ নাগরিকত্বের আবেদন ও সাক্ষাৎকারে নিজেকে কখনো মার্কিন নাগরিক দাবি করেননি এবং ভোট দেননি বলে জানিয়েছিলেন।
তদন্তকারীদের কাছে লাইন জানিয়েছেন, তাঁর মা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ায় তিনি নিজেকেও মার্কিন নাগরিক মনে করেছিলেন। চার দশকের বেশি সময় আগে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তাঁর মা নাগরিকত্ব পান। তবে তখন লাইনের বয়স ছিল ১৯ বছর। ফলে মায়ের নাগরিকত্বের মাধ্যমে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাননি বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি বছরের জুনে নতুন সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড নিতে গিয়ে তিনি নিজের নাগরিকত্বের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন বলে জানিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা দুটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে দীর্ঘ কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে।
অভিযুক্তদের মধ্যে ভারতীয় বংশোদ্ভূত অমনদীপ কাউরও রয়েছেন। তাঁর স্বামী কুলবিন্দর সিং জানিয়েছেন, স্ত্রী আট বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। ২০২৪ সালে ড্রাইভার লাইসেন্স নেওয়ার সময় তিনি হিন্দি ভাষায় লিখিত পরীক্ষা দিয়েছিলেন, কারণ ইংরেজিতে তাঁর দক্ষতা সীমিত। ওই সময় ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিলেন কি না, তা পরিবার নিশ্চিত নয়। সিংয়ের দাবি, ২০২৪ সালে ডাকযোগে পাওয়া একটি ব্যালটকে তাঁরা নিবন্ধনসংক্রান্ত ফরম মনে করেছিলেন এবং সেটি ফেরত পাঠিয়েছিলেন।
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্বপ্রত্যাশী অভিবাসীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে সামনে এসেছে। ড্রাইভার লাইসেন্সের আবেদন, ভোটার নিবন্ধন এবং নাগরিকত্বের ফরমে দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকলে তা তদন্তের বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে নাগরিকত্বের আবেদনে আগে কখনো নিজেকে মার্কিন নাগরিক দাবি করা হয়েছে কি না অথবা কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকে। তবে ভুলবশত ভোটার নিবন্ধন, ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্য দেওয়া এবং বেআইনিভাবে ভোট দেওয়ার বিষয়গুলো আইনগতভাবে এক নয়। প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি ও প্রমাণ আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয়।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভোটার নিবন্ধন ও ভোট দেওয়ার ঘটনা শনাক্ত করতে অভিযান জোরদার করেছে। বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়া সরকারের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে। ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দাবি, রাজ্যের ভোটার তালিকায় প্রায় ২০ হাজার এমন ব্যক্তি থাকতে পারেন, যাঁরা মার্কিন নাগরিক নন। তবে এটি সরকারের প্রাথমিক শনাক্তকরণভিত্তিক দাবি। সংশ্লিষ্ট সবাই যে নাগরিক নন অথবা বেআইনিভাবে ভোট দিয়েছেন, তা আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
ক্যালিফোর্নিয়া কর্তৃপক্ষ অভিযোগের বিরোধিতা করেছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, তারা ফেডারেল নির্বাচনী আইন মেনে চলছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সন্দেহভাজন ভোটারের সংখ্যা অতিরঞ্জিত হতে পারে। রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টা বলেছেন, বিচ্ছিন্নভাবে অনিয়মের ঘটনা ঘটতে পারে, তবে ক্যালিফোর্নিয়ায় ব্যাপক ভোট জালিয়াতির প্রমাণ নেই। রাজ্যটিতে ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটার রয়েছেন। নির্বাচনী তথ্য বিশ্লেষণেও নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে উঠে এসেছে।
ফেডারেল হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, তদন্তে নাগরিকত্বের আবেদনসহ বিভিন্ন সরকারি নথি পর্যালোচনা করা হয়েছে। কয়েকটি মামলার নথিতে আগস্ট মাসে পরিচালিত একটি সরকারি সুবিধাসংক্রান্ত নিরীক্ষার উল্লেখ রয়েছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কীভাবে প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈধ ভোটারদের অধিকার রক্ষা এবং নির্বাচনী আইন কার্যকর করাই অভিযানের উদ্দেশ্য।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের গ্রিন কার্ডধারীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। গ্রিন কার্ডধারী ব্যক্তিরা সাধারণভাবে ফেডারেল নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। নাগরিকত্বের আবেদনেও আগের ভোটার নিবন্ধন ও ভোট দেওয়ার ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ভুলবশত ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে থাকলে অথবা নিজের নাগরিকত্বের অবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকলে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগ্য ইমিগ্রেশন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
SOURCE - অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)