Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ক্যানসারের নতুন এমআরএনএ টিকায় আশার আলো, রোগ ফেরার ঝুঁকি কমেছে ৪২ শতাংশ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম

ক্যানসারের নতুন এমআরএনএ টিকায় আশার আলো, রোগ ফেরার ঝুঁকি কমেছে ৪২ শতাংশ

বিজ্ঞাপন

ত্বকের মারাত্মক ক্যানসার মেলানোমার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতির খবর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা। রোগীর শরীরের ক্যানসার কোষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি নতুন এমআরএনএ টিকা ব্যবহারে অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মডার্না ও মার্কের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে এই ফল পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত গবেষণার বিস্তারিত ফলাফলে ক্যানসারের ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে পরীক্ষামূলক এই টিকা এখনো সাধারণ রোগীদের ব্যবহারের জন্য অনুমোদন পায়নি।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন টিকাটির নাম ইন্টিসমেরান অটোজিন। এটি এমআরএনএ প্রযুক্তিতে তৈরি, যে প্রযুক্তি করোনাভাইরাসের টিকা তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে প্রচলিত টিকার সঙ্গে এর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রতিটি রোগীর ক্যানসার কোষের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে আলাদাভাবে এই টিকা তৈরি করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে ক্যানসার কোষ আবার তৈরি হলে তা শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে।

গবেষণার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় অংশ নেন ১ হাজার ১৩৭ জন মেলানোমা রোগী। তাঁদের প্রত্যেকের শরীর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার অপসারণ করা হয়েছিল। এরপর সবাইকে প্রচলিত ইমিউনোথেরাপি ওষুধ কিট্রুডা দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের একটি দল অতিরিক্তভাবে নতুন এমআরএনএ টিকা পান, অন্য দলকে দেওয়া হয় প্লাসিবো। প্রায় দুই বছর পর্যবেক্ষণের পর দেখা যায়, টিকা পাওয়া রোগীদের ৮২ দশমিক ২ শতাংশের ক্যানসার ফিরে আসেনি। অন্যদিকে শুধু প্রচলিত চিকিৎসা পাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭০ শতাংশ।

গবেষণার বিস্তারিত ফল অনুযায়ী, নতুন টিকা ও কিট্রুডা একসঙ্গে ব্যবহারে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর আপেক্ষিক ঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে শরীরের দূরবর্তী অঙ্গে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছে ৩৮ শতাংশ। তবে এর অর্থ এই নয় যে টিকা গ্রহণকারী প্রত্যেক রোগীর ক্যানসার সেরে গেছে কিংবা তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি ৪২ শতাংশ কমেছে। গবেষণায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রোগ ফিরে আসা এবং মৃত্যুর সম্মিলিত ঝুঁকি পরিমাপ করা হয়েছে। রোগীদের সামগ্রিক আয়ু কতটা বাড়বে, তা জানতে আরও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

নতুন এই চিকিৎসাপদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা টিকা তৈরি করা। প্রথমে অস্ত্রোপচারে অপসারণ করা টিউমারের নমুনা থেকে জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেন গবেষকেরা। এরপর সেই তথ্য ব্যবহার করে এমন এমআরএনএ টিকা তৈরি করা হয়, যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষের বিশেষ প্রোটিন চিনতে সহায়তা করে। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের সর্বোচ্চ নয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ডোজের মধ্যে তিন সপ্তাহের ব্যবধান রাখা হয়। মডার্নার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, টিউমারের জিনগত বিশ্লেষণ থেকে টিকা তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ছয় সপ্তাহ বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে অবস্থিত এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের চিকিৎসক ও গবেষক ড. হুসেইন তাওবি এই ফলাফলকে ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। গবেষণায় সরাসরি যুক্ত নন এমন বিশেষজ্ঞরাও ব্যক্তিভিত্তিক টিকার সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির লম্বার্ডি কমপ্রিহেনসিভ ক্যানসার সেন্টারের উপপরিচালক ড. মাইকেল অ্যাটকিনস মনে করেন, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় কাজে আসতে পারে। তবে অন্য ক্যানসারের ক্ষেত্রেও একই ফল পাওয়া যাবে কি না, তা পৃথক গবেষণায় নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২ বছর বয়সী টনি হাউটের অভিজ্ঞতাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। কানে দীর্ঘদিন ধরে একটি ক্ষত থেকে মাঝেমধ্যে রক্তপাত হচ্ছিল তাঁর। পরে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে মেলানোমা শনাক্ত করেন। অস্ত্রোপচারের সময় দেখা যায়, ক্যানসার ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ২০২৪ সালে তিনি এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টারের পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় অংশ নেন। সর্বশেষ পরীক্ষায় তাঁর শরীরে ক্যানসারের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে একজন রোগীর এই ফলাফল দিয়ে সবার ক্ষেত্রে চিকিৎসাটির কার্যকারিতা নির্ধারণ করা যায় না।

নতুন টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও তথ্য প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। সাধারণ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা, ক্লান্তি এবং শরীরের অন্যান্য সাময়িক অস্বস্তি। তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় গুরুতর চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার নতুন টিকা ও কিট্রুডা পাওয়া দলে ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। শুধু কিট্রুডা পাওয়া দলে এই হার ছিল ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ফলে চিকিৎসার সম্ভাব্য উপকারের পাশাপাশি নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

এর আগে দ্বিতীয় ধাপের গবেষণায় পাঁচ বছরের পর্যবেক্ষণে নতুন টিকার সঙ্গে কিট্রুডা ব্যবহারে ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ কমার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে সেটি ছিল তুলনামূলক ছোট গবেষণা। নতুন তৃতীয় ধাপের বড় পরীক্ষায় ঝুঁকি কমার হার পাওয়া গেছে ৪২ শতাংশ। দুটি ফল আলাদা গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ সময়ের ভিত্তিতে তৈরি হওয়ায় এগুলোকে একই ফল হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। সর্বশেষ গবেষণার বিস্তারিত ফল ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিকেল অনকোলজির সম্মেলনে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মডার্না ও মার্ক জানিয়েছে, তারা নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির অনুমোদনের বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ এখনো এই টিকা অনুমোদন করেনি। ফলে এটি বর্তমানে সাধারণ রোগীদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে না। টিকাটির সম্ভাব্য দামও প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠান দুটি। প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদাভাবে উৎপাদনের প্রয়োজন হওয়ায় ভবিষ্যতে এর খরচ ও সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

মেলানোমা ত্বকের ক্যানসারের একটি গুরুতর ধরন, যা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমানে ফুসফুস, কিডনি, অগ্ন্যাশয়সহ আরও কয়েক ধরনের ক্যানসারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে নতুন ফলাফলকে সব ধরনের ক্যানসারের প্রতিষেধক আবিষ্কার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গবেষকেরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে আরও পরীক্ষা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া সফল হলে ব্যক্তিভিত্তিক এমআরএনএ টিকা ক্যানসার চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার