Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ফসলহানি ও খাদ্যসংকটে বিপর্যস্ত সুদান, অনিশ্চয়তায় লাখো মানুষের জীবন

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম

ফসলহানি ও খাদ্যসংকটে বিপর্যস্ত সুদান, অনিশ্চয়তায় লাখো মানুষের জীবন

বিজ্ঞাপন

সুদানে চলমান যুদ্ধের মধ্যে এবার ভয়াবহ খরা দেশটির খাদ্যসংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, গবাদিপশুর জন্য চারণভূমির সংকট এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার অর্থ কমে যাওয়ায় দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়ছে।

জাতিসংঘ-সমর্থিত খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে সুদানে প্রায় ৫১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে ছিলেন। তবে এই হিসাবটি জুন মাসের পরিস্থিতির ভিত্তিতে তৈরি; নতুন সংকটের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পূর্বাভাস অনুযায়ী, খরার কারণে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ আরও প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। ২০২৭ সালের আগস্টের মধ্যে অতিরিক্ত সংকটাপন্ন মানুষের সংখ্যা ১২ লাখে পৌঁছাতে পারে।

সুদানে সাধারণত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টি বর্ষা মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সময়ে দেশজুড়ে বৃষ্টিপাত গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। উত্তর দারফুরে বৃষ্টিপাত ১৯৮৪ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। একইভাবে উত্তর কর্দোফান ও গেদারেফ অঞ্চলেও বৃষ্টির ঘাটতি কৃষি উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

দেশটির বহু কৃষক বৃষ্টিনির্ভর কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে বীজ বপন ও ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। একজন বড় কৃষক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তাঁর প্রত্যাশিত ফসলের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় মাত্র এক-চতুর্থাংশে নেমে আসতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে খাদ্যের সরবরাহও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিলে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর থেকে যুদ্ধ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বহু মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, কৃষিজমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন এবং জীবিকা হারিয়েছেন।

যুদ্ধের কারণে অনেক এলাকায় কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও নিরাপত্তাহীনতার কারণে কৃষক জমিতে যেতে পারছেন না, আবার কোথাও উৎপাদিত খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে খরা যুক্ত হওয়ায় সংকট মোকাবিলার সুযোগ আরও কমে গেছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইপিসির ১২ অক্টোবরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বৃহত্তর দারফুর ও বৃহত্তর কর্দোফানের বিভিন্ন এলাকায় সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, খরা এবং পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তার অভাবে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকট ও সীমিত স্বাস্থ্যসেবা অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষের জন্য রোগ ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।

সংকটের সময়ে খাদ্যসহায়তা মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন হলেও অর্থের অভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সুদানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কার্যক্রমের জন্য প্রায় ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার অর্থায়ন ছিল, যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। খরার কারণে সৃষ্ট ক্ষুধা মোকাবিলায় সংস্থাটির আরও ১৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার প্রয়োজন।

দারফুরের তাওয়িলা এলাকার একটি বড় বাস্তুচ্যুত শিবিরে খাদ্য বরাদ্দ অর্ধেক করা হয়েছে বলে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক কার্ল স্কাউ জানিয়েছেন। ওই শিবিরে প্রায় সাত লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ বসবাস করছেন। খাদ্যসহায়তা কমে যাওয়ার সময়েও সেখানে নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের আগমন অব্যাহত রয়েছে। ফলে সীমিত সম্পদ দিয়ে সবার চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

খাদ্যসংকট দীর্ঘায়িত হলে শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক মানুষ এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে সুদানে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশুর গুরুতর তীব্র অপুষ্টিতে ভোগার আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়ার পাশাপাশি নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচ্ছন্নতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় সংক্রমণজনিত রোগে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সংঘাত বন্ধ, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ত্রাণ প্রবেশের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত অর্থায়ন জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকদের সহায়তা, পানি সরবরাহ পুনরুদ্ধার এবং শিশুদের পুষ্টি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সুদানের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু খরার ফল নয়; দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, কৃষি উৎপাদনের পতন এবং মানবিক সহায়তার ঘাটতি মিলেই সংকটকে আরও গভীর করেছে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী মাসগুলোতে আরও বহু মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাসকে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চূড়ান্ত সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার