বিজ্ঞাপন
স্মৃতিশক্তি হারানোর রোগ শনাক্তে নতুন অগ্রগতি, প্রথম রক্ত পরীক্ষায় অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫১ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে আলঝেইমার রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রে নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে। ২০২৫ সালের মে মাসে দেশটির খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) প্রথমবারের মতো এমন একটি রক্ত পরীক্ষার অনুমোদন দেয়, যা আলঝেইমার রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকদের সহায়তা করতে পারে। আগে এই রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অ্যামাইলয়েড প্লাক শনাক্ত করতে সাধারণত মেরুদণ্ডের তরল পরীক্ষা অথবা ব্যয়বহুল পিইটি স্ক্যানের মতো পদ্ধতির প্রয়োজন হতো। নতুন পরীক্ষায় সাধারণ রক্তের নমুনা ব্যবহার করা হয়, ফলে রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কম কষ্টকর হতে পারে।
আলঝেইমার অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, নতুন পরীক্ষাটি রক্তের নমুনার মাধ্যমে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড প্লাকের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। এই প্লাক আলঝেইমার রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তবে পরীক্ষাটি একাই রোগ নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়নি; রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসার ইতিহাস এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মিলিয়ে চিকিৎসকদের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে।
এই অগ্রগতিকে ঘিরে আশার কথা জানিয়েছেন আলঝেইমার অ্যাসোসিয়েশনের স্বেচ্ছাসেবক জোলিন ডি ব্র্যাঙ্গো। তাঁর শ্বশুর এই রোগে মারা গেছেন। রোগী, পরিবারের সদস্য, পরিচর্যাকারী এবং ভবিষ্যতে নিজেরাও আক্রান্ত হতে পারেন—এমন মানুষের জন্য নতুন পরীক্ষাটি আশার বার্তা নিয়ে এসেছে বলে মনে করেন তিনি।
ডি ব্র্যাঙ্গোর ভাষায়, আলঝেইমার শুধু কারও নাম ভুলে যাওয়া কিংবা নিজের পরিচয় মনে করতে না পারার বিষয় নয়। রোগটি ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। একসময় মস্তিষ্ক শরীরের অন্যান্য অংশকে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতাও হারাতে থাকে। তাঁর এই অভিজ্ঞতা রোগটির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং রোগী ও পরিবারের ওপর এর মানসিক চাপের বিষয়টি তুলে ধরে।
নতুন পরীক্ষাটি তৈরি করেছে ফুজিরেবিও ডায়াগনস্টিকস। এর নাম লুমিপালস জি পিটাউ২১৭/বিটা-অ্যামাইলয়েড ১-৪২ প্লাজমা রেশিও। এটি রক্তের প্লাজমায় থাকা দুটি প্রোটিনের মাত্রা পরিমাপ করে এবং তাদের অনুপাত হিসাব করে। এই অনুপাতের মাধ্যমে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড প্লাক থাকার সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পিইটি স্ক্যান বা মেরুদণ্ডের তরল সংগ্রহের মতো পদ্ধতির প্রয়োজন কমতে পারে।
এফডিএর মূল্যায়নে ৪৯৯ জনের রক্তের নমুনা নিয়ে করা একটি ক্লিনিক্যাল গবেষণার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। পরীক্ষায় যাঁদের ফল পজিটিভ এসেছিল, তাঁদের ৯১ দশমিক ৭ শতাংশের ক্ষেত্রে পিইটি স্ক্যান বা মেরুদণ্ডের তরল পরীক্ষায় অ্যামাইলয়েড প্লাকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছিল। অন্যদিকে, যাঁদের ফল নেগেটিভ এসেছিল, তাঁদের ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে তুলনামূলক পরীক্ষাগুলোতেও প্লাকের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। তবে কিছু রোগীর ফল অনিশ্চিত ছিল। এ কারণে চিকিৎসকের মূল্যায়ন ছাড়া শুধু এই পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।
আলঝেইমার রোগের এখনো কোনো নিরাময় নেই। তবে কিছু ওষুধ রোগের অগ্রগতি ধীর করতে পারে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত রোগীরা আগেভাগে চিকিৎসার সুযোগ পেতে পারেন। ডি ব্র্যাঙ্গোর মতে, রোগের অগ্রগতি ধীর করার চিকিৎসা শুরু করা গেলে রোগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে আরও কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ পেতে পারেন। প্রিয়জন যেন পরিবারের সদস্যদের চিনতে পারেন এবং পছন্দের কাজগুলো করতে পারেন—সেই সময়টুকুও পরিবারের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
এফডিএর তৎকালীন কমিশনার মার্টিন এ. মাকারি বলেন, আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা স্তন ক্যানসার ও প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত মানুষের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রায় ১০ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রোগ নির্ণয়ের নতুন প্রযুক্তি রোগীদের জন্য সহায়ক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আলঝেইমার স্মৃতি ও চিন্তাশক্তিকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সময়ের সঙ্গে রোগটি আরও জটিল হয়ে ওঠে এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাও কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এ রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন, আর বিশ্বজুড়েও বহু মানুষ এই সমস্যায় ভুগছেন। এটি ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে পরিচিত ধরন।
তবে নতুন রক্ত পরীক্ষা সবার জন্য সাধারণ স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়। এটি মূলত ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সী এবং আলঝেইমার বা জ্ঞানীয় সক্ষমতা কমে যাওয়ার লক্ষণ রয়েছে—এমন রোগীদের মূল্যায়নে চিকিৎসকদের সহায়তার জন্য অনুমোদিত হয়েছিল। ভুল পজিটিভ বা ভুল নেগেটিভ ফলের সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষা মিলিয়েই রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।