বিজ্ঞাপন
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনীতি নিয়ে হতাশা বাড়ছে, ট্রাম্পের আমলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি মার্কিনিদের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৪১ এএম
বিজ্ঞাপন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রকৃত মজুরি গড়ে বাড়েনি। অর্থাৎ, কর্মীদের বেতন বাড়লেও নিত্যপণ্য ও অন্যান্য সেবার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সেই বৃদ্ধি তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আগের তুলনায় বেশি বেতন পেয়েও অনেক মার্কিনির ক্রয়ক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএলএস) সর্বশেষ তথ্য থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সময়ে পণ্য ও সেবার দামও বেড়েছে প্রায় একই হারে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির বড় অংশই মূল্যবৃদ্ধির কারণে কার্যত হারিয়ে গেছে। মজুরি বাড়লেও সেই অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় বেশি পণ্য বা সেবা কেনার সুযোগ তৈরি হয়নি।
সর্বশেষ পরিসংখ্যানে পরিস্থিতির আরও অবনতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর গড় ঘণ্টাপ্রতি প্রকৃত মজুরি কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। ওই মাসে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছিল মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে, ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মীদের আয় সামান্য বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় তার চেয়ে বেশি বেড়েছে।
বার্ষিক হিসাবেও একই চাপ দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকৃত ঘণ্টাপ্রতি মজুরি কমেছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে ৩ শতাংশ, কিন্তু ভোক্তা মূল্যসূচক বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। উৎপাদন ও তদারকির দায়িত্বে নেই—এমন কর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রকৃত ঘণ্টাপ্রতি মজুরি এক বছরে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
গত ছয় মাস ধরে মূল্যস্ফীতি গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোকে দৈনন্দিন ব্যয় সামলাতে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার আয়ের বড় অংশ খাবার, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় করে, তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক ভোক্তা মূল্যসূচক এক মাসে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ এবং এক বছরের ব্যবধানে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। পেট্রলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় সাধারণ মানুষের ব্যয়ও বেড়েছে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়ি চালানোর খরচ নয়, পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয়েও প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অর্থনীতি, নিত্যপণ্যের দাম ও পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক মার্কিনি মনে করছেন, তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ এখনো কমেনি। চলতি বছরের শুরুতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর জ্বালানির দাম বাড়ার বিষয়টিও মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
হোয়াইট হাউস অবশ্য অর্থনীতির চিত্রকে ভিন্নভাবে তুলে ধরেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে আগ্রাসী অর্থনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর দাবি, এসব পদক্ষেপ বাইডেন প্রশাসনের সময়কার মূল্যস্ফীতির সংকটের প্রভাব কমিয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছে, মজুরি বৃদ্ধি করেছে এবং বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। যেসব শিল্প ও কাজ একসময় দেশের বাইরে চলে গিয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রেও কর্মসংস্থান তৈরির দাবি করেছে প্রশাসন।
তবে প্রকৃত মজুরির হিসাব সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। শুধু বেতন কতটা বেড়েছে, তা দেখলেই পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। সেই আয়ে আগের তুলনায় কতটা পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে, সেটিও বিবেচনা করতে হয়। মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির ব্যবধান না থাকলে আয় বাড়ার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে এখন পর্যন্ত গড় মজুরি বৃদ্ধির প্রায় পুরোটা মূল্যবৃদ্ধিতে সমন্বিত হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান আরও দেখাচ্ছে, সাম্প্রতিক মাসে প্রকৃত মজুরি কমেছে। ফলে অর্থনীতি নিয়ে সরকারের ইতিবাচক বক্তব্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগও সামনে থাকছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা ভোটারদের মনোভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।