বিজ্ঞাপন
ডায়াবেটিস ও স্থূলতার ওষুধে ধীর হতে পারে বার্ধক্য, নতুন গবেষণায় মিলল আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩১ এএম
বিজ্ঞাপন
ডায়াবেটিস ও স্থূলতার চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ শরীরের বার্ধক্য প্রক্রিয়াও ধীর করতে পারে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে—ওজন কমানো ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এসব ওষুধ মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময়ও বাড়াতে পারবে কি না।
জিএলপি-১ ওষুধের পরিচিত উপকারিতা শুধু ওজন কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন গবেষণায় হৃদ্যন্ত্র, কিডনি ও যকৃতের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং স্লিপ অ্যাপনিয়া ও শরীরের প্রদাহ কমানোর মতো সম্ভাব্য সুবিধাও উঠে এসেছে। এসব সমস্যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবনতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের অধ্যাপক ডানিকা চেনের মতে, বয়স বাড়া অনেক রোগের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। তাই শুধু আলাদা আলাদা রোগের চিকিৎসা না করে বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে কাজ করা গেলে বয়সজনিত নানা রোগের ঝুঁকি কমানোর নতুন পথ তৈরি হতে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, জিএলপি-১ ওষুধকে এখনই বার্ধক্য প্রতিরোধের চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার ফল এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এসব ওষুধের সম্ভাব্য সুবিধা শুধু অতিরিক্ত ওজন বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমিত কি না, নাকি স্বাভাবিক ওজনের সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও একই প্রভাব দেখা যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
লস এঞ্জেলেসের সিডারস-সিনাই মেডিকেল সেন্টারের সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড জেরোথেরাপিউটিকসের পরিচালক জেমস কার্কল্যান্ডও এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, প্রাথমিক গবেষণার ফল দেখে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত কারণ ছাড়াই এসব ওষুধ ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে কম বয়সী, স্বাভাবিক ওজনের এবং ডায়াবেটিস নেই—এমন মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট তথ্য নেই।
গবেষকেরা আরও বলছেন, বার্ধক্য পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত জৈবিক সূচকগুলো এখনো উন্নয়নশীল। ফলে এসব পরীক্ষার ফল দেখে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির শরীর কতটা বুড়িয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
জৈবিক বয়সের ঘড়িতে কী দেখা গেছে
বার্ধক্য নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে টিরজেপাটাইড নামের ওষুধ। এটি এলি লিলি কোম্পানির তৈরি। ওজন কমানোর জন্য ওষুধটি জেপবাউন্ড এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য মাউনজারো নামে বিক্রি হয়।
কোম্পানিটির গবেষকেরা তাদের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ওষুধটি ব্যবহারকারীদের শরীরে বার্ধক্যের কিছু জৈবিক সূচক তুলনামূলক ধীরগতিতে পরিবর্তিত হয়েছে।
মূল পরীক্ষায় ৭০০ জনের বেশি অতিরিক্ত ওজনের, তবে ডায়াবেটিস নেই—এমন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। তাঁদের ৭২ সপ্তাহ ধরে টিরজেপাটাইড অথবা সেমাগ্লুটাইড দেওয়া হয়। পরবর্তী বার্ধক্যবিষয়ক বিশ্লেষণে টিরজেপাটাইড গ্রহণকারী ৫০ বছরের বেশি বয়সী ৭১ জনের তথ্য দেখা হয়।
রক্তে নির্দিষ্ট জিনের কার্যক্রমের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এপিজেনেটিক ক্লক ব্যবহার করেন। এই পদ্ধতিতে শরীরের কোষ ও টিস্যুর জৈবিক বয়সের আনুমানিক পরিবর্তন বোঝার চেষ্টা করা হয়। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বয়স বাড়লেও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ একই গতিতে বুড়িয়ে যায় না—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এ ধরনের পরীক্ষা করা হয়।
গবেষকদের হিসাবে, ৭২ সপ্তাহে একজন ব্যক্তির ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বয়স প্রায় ১ দশমিক ৩৮ বছর বাড়ার কথা। কিন্তু টিরজেপাটাইড গ্রহণকারী ছোট দলটির বিভিন্ন জৈবিক ঘড়িতে বয়স বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল প্রায় ০ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ১ বছর। কয়েকটি সূচকে জৈবিক বয়স কমার ইঙ্গিতও দেখা গেছে।
তবে এই পরীক্ষায় ওষুধ না নেওয়া কোনো প্লাসিবো দলের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণের সময়ও ছিল সীমিত। তাই ওষুধটি সত্যিই বার্ধক্য ধীর করেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে চার-পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা গেলে এই প্রভাব সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সেমাগ্লুটাইডেও মিলেছে একই ধরনের ইঙ্গিত
সেমাগ্লুটাইড নামের আরেকটি ওষুধ নিয়েও আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। এটি ওজন কমানোর জন্য ওয়েগোভি এবং ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় ওজেম্পিক নামে পরিচিত।
ওষুধ প্রস্তুতকারী নোভো নরডিস্কের গবেষকেরা পাঁচটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়া ১০ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। রক্তে থাকা বিভিন্ন প্রোটিনের পরিবর্তন ব্যবহার করে তাঁরা হৃদ্যন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জৈবিক বয়স অনুমান করেন।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্লাসিবো গ্রহণকারীদের তুলনায় সেমাগ্লুটাইড ব্যবহারকারীদের হৃদ্যন্ত্রের জৈবিক বয়সের সূচকে দুই থেকে চার বছরের পার্থক্য ছিল। কিডনি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও অগ্ন্যাশয়সহ কয়েকটি অঙ্গের ক্ষেত্রেও এক থেকে চার বছরের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
গবেষকদের দাবি, এসব পরিবর্তন শুধু ওজন কমা, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ বা প্রদাহ হ্রাস দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি। তবে গবেষণাটি এখনো পিয়ার রিভিউয়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়নি। তাই ফলাফলকে প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
ইঁদুরের আয়ু বেড়েছে, মানুষের ক্ষেত্রে কী হবে
মানুষের পাশাপাশি ইঁদুরের ওপরও পরীক্ষা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বার্কলের গবেষকেরা ২০ মাস বয়সী ইঁদুরকে সেমাগ্লুটাইড অথবা প্লাসিবো দেন। ইঁদুরের এই বয়সকে মানুষের প্রায় ৬০ বছরের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
পরীক্ষায় সেমাগ্লুটাইড পাওয়া ইঁদুরগুলো তুলনামূলক কম খাবার খেয়েছে, ওজন হারিয়েছে এবং প্লাসিবো পাওয়া ইঁদুরের চেয়ে বেশি দিন বেঁচেছে। ওষুধ গ্রহণকারী ইঁদুরের গড় আয়ু ছিল ৮৩৪ দিন। অন্যদিকে প্লাসিবো পাওয়া ইঁদুরের মোট আয়ু ছিল ৭৪২ দিন।
এরপর ওষুধের প্রভাব ও কম ক্যালরি গ্রহণের প্রভাব আলাদা করে বোঝার জন্য আরেক দল ইঁদুরের খাবারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়। এই দলটির আয়ুও বেড়েছিল।
তবে দুই দলের মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। পেশির কার্যকারিতা ও চলাফেরার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দলের ফল কাছাকাছি থাকলেও সেমাগ্লুটাইড পাওয়া ইঁদুর চিন্তাভাবনা এবং গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার পরীক্ষায় ভালো করেছে। রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণেও তাদের কিছু সুবিধা দেখা গেছে।
গবেষকদের ধারণা, ওষুধটির সম্ভাব্য প্রভাব শুধু কম ক্যালরি গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। তবে ইঁদুরের ওপর পাওয়া ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যাবে না।
সব মিলিয়ে, জিএলপি-১ ওষুধ বার্ধক্য ধীর করা এবং সুস্থ জীবনকাল বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু মানুষের আয়ু সত্যিই বাড়ে কি না, স্বাভাবিক ওজনের সুস্থ ব্যক্তিরা এতে উপকৃত হন কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই শুধু দীর্ঘায়ুর আশায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার করা এখনই সমর্থন করছেন না বিশেষজ্ঞরা।