বিজ্ঞাপন
আবারও ইয়েমেন যুদ্ধে জড়াচ্ছে আরব আমিরাত
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
বিজ্ঞাপন
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি সরকারি বাহিনীকে আবার অর্থ দেওয়া শুরু করতে সম্মত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর বিনিময়ে হুতিবিরোধী বাহিনীকে আকাশপথে সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে সৌদি আরব। ইয়েমেনের কয়েকটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
নতুন এই সহযোগিতা চুক্তিকে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইউএই ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ কমে আসার প্রথম দৃশ্যমান লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইয়েমেনজুড়ে হুতিদের অগ্রযাত্রায় উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর শাসকেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
সৌদি আরব প্রতিদিন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ছে। হুতিদের হামলায় দেশটির বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর কিছু অংশ অচল হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতেও হিমশিম খাচ্ছে দেশটি।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বাহিনীগুলোর মধ্যে জায়ান্ট ব্রিগেডস অন্যতম। আগে এই বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করত ইউএই। হুতিবিরোধী বিচ্ছিন্ন সামরিক জোটের সবচেয়ে কার্যকর বাহিনীগুলোর একটি হিসেবে তাদের বিবেচনা করা হয়। তবে গত জানুয়ারিতে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান থেকে সরে গিয়ে বাহিনীটির অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় ইউএই।
ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গত সপ্তাহে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবি জানালেও সৌদি আরব ও ইউএই এখনো এ বিষয়ে কোনো সাড়া দেয়নি। এই গণভোট হলে ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা সীমান্তব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হতে পারে। ওই সময় ইয়েমেন দুটি পৃথক রাষ্ট্র ছিল।
বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশন কাউন্সিলও (এসটিসি) এখনো তাদের সেনাদের পুরোনো দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে লড়াই করার অনুমতি দেয়নি। তবে গণভোটের অনুমতি দিতে সৌদি আরব স্পষ্টভাবে সম্মত হলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার গত সপ্তাহে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের কাছ থেকে ফিরিয়ে নিতে পাল্টা অভিযান শুরুর ঘোষণা দেয়। তবে মারিবের কাছে মাজজার ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি এলাকায় এ পর্যন্ত সামরিক অভিযানে সীমিত সাফল্য এসেছে।
এসটিসি নেতা এইদারুস আল-জুবাইদি ও সৌদি কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও নেই। দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং দুই বছরের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর গত জানুয়ারিতে আবুধাবিতে পালিয়ে যান জুবাইদি। এর জবাবে এসটিসি বাহিনীর জন্য পাঠানো ইউএইর অস্ত্রের চালানে বোমা হামলা চালায় সৌদি আরব।
এরপর ইয়েমেনে সব ধরনের সম্পৃক্ততা বন্ধের ঘোষণা দেয় ইউএই। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জানায়, তারা জুবাইদিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করবে।
ইয়েমেনের চলমান সংঘাত নিয়ে ইউএইর কর্মকর্তারা গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও হুতিরা পুরোনো দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে থাকা শেষ দুটি শহর তাইজ ও মারিব দখলে নেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
শুক্রবার হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র এডেন বিমানবন্দরে আঘাত হানে। তখন একটি যাত্রীবাহী বিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-এরিয়ানির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ইয়েমেনিয়া এয়ারওয়েজের বিমান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার এবং রানওয়ের মাঝামাঝি অংশ থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে আঘাত হানে।
এর এক দিন আগে এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হুতিদের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন।
মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি জানিয়েছেন, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশটির সামরিক বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দিতে তিনি পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন ডাকছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, মিসর কোনো আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেবে না; শুধু সৌদি আরবকে রক্ষা করবে।
যুক্তরাজ্যেও সৌদি আরবের আরও সামরিক সহায়তার অনুরোধ নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশটি ইতিমধ্যে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের একটি ভয়েজার আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান পাঠিয়েছে। তবে আঞ্চলিক কূটনীতিকেরা যুক্তরাজ্যের কাছে আরও সহায়তা দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ওমান ও কাতারসহ অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা উচিত কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন বিমান হামলায় যুক্তরাজ্যের সার্বিক সমর্থনের আইনি দিকও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত রায় দিয়েছিলেন, ২০১৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ইয়েমেনে সৌদি আরবের আগের বোমা হামলার সময় অস্ত্র রপ্তানির অনুমতিপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য বেআইনি কাজ করেছিল।
ক্যাম্পেইন অ্যাগেইনস্ট আর্মস ট্রেডের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনে সৌদি আরবের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাজ্য যথাযথ মূল্যায়ন করেনি। এর ফলে নিজেদের পদ্ধতি সংশোধন করতে বাধ্য হয় দেশটি।
সৌদি আরবের দাবি, এরপর থেকে তারা নিজেদের পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে। দেশটি বলছে, জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করেই তারা পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রেসিডেন্সিয়াল বিবৃতি গ্রহণ করে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সৌদি আরবের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়।
গত আগস্ট থেকে চলা যুদ্ধে মোট কতজন নিহত হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এতে এডেনভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান