বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ নিয়ে বৃটিশ হোম অফিসের গাইড লাইন প্রকাশ
যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৩ এএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বৃটিশ হোম অফিস ''ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন' শিরোনামের একটি কান্ট্রি গাইডলাইন প্রকাশ করেছে।
২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত, ‘কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিম’ (CPIT)-এর ৩ জন কর্মকর্তা বাংলাদেশ সফর করেন। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান এবং একই বছরের আগস্টের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে। বৃটিশ ওই তিন কর্মকর্তা ১৫টি সাক্ষাৎকারে মোট ২৪ জনের সঙ্গে কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারদাতাদের মধ্যে ছিলেন রাজনৈতিক প্রতিনিধি, পুলিশ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন, আইনগত সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা সংস্থার প্রতিনিধিরা। এরপর ১৪ই অক্টোবর বৃটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস ) প্রকাশ করেছে ৮৬ পৃষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন।
প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে বিরোধী দলগুলোর কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস এবং বহু পুরোনো মামলা প্রত্যাহারের তথ্য রয়েছে; অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, পুলিশের জবাবদিহি এবং সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগও স্পষ্ট।
রিপোর্টে বলা হয় , ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কাল পেরিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে।
রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের সংগঠন এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে যে, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ (AL) সরকারের আমলের তুলনায় বর্তমানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা, মতামত প্রকাশ এবং জনবিতর্কে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা রয়েছে। তবে দুর্নীতি, পুলিশের জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা, এবং গণঅভ্যুত্থানের পর প্রস্তাবিত ব্যাপক সংস্কারগুলোর সীমিত বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP) এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এখন অবাধে সংগঠিত হওয়া, প্রচারণা চালানো, প্রতিবাদ করা এবং সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা এখনো ঘটছে, তবে তা মূলত স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। এসব ঘটনার পেছনে সাধারণত স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে বিরোধ কাজ করে।
বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনটি ছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ এবং পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এতে সহিংসতার মাত্রা ছিল অনেক কম; এছাড়া নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার হারও হ্রাস পেয়েছে।
আওয়ামী লীগ এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে এবং একটি সংগঠন হিসেবে দলটির প্রতি জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও বিদ্বেষ বজায় রয়েছে। এর কারণ হলো ক্ষমতায় থাকাকালীন দলটির দ্বারা সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা।
আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের যেসব সমর্থক দুর্নীতি, সহিংসতা বা দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, তারা সাধারণত নিজ নিজ এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই বসবাস করতে পারছেন। তবে যারা প্রকাশ্যে দলটির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করছেন, তারা হয়রানি, সামাজিক বিদ্বেষ বা সহিংসতার শিকার হতে পারেন। আওয়ামী লীগের অনেক সাবেক সদস্য অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, বাংলাদেশের ভেতরেই অন্য জায়গায় চলে গেছেন অথবা দেশত্যাগ করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অধিকাংশই মুক্তি পেয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অধিকাংশ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা এমন ২১ হাজারেরও বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
আওয়ামী লীগের অনেক রাজনীতিবিদ, কর্মী ও কর্মকর্তা এখনো বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন; এসব মামলার সঙ্গে সাবেক সরকারের আমলের কর্মকাণ্ড এবং ২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এবং সাধারণ—উভয় আদালতেই এসব মামলার কার্যক্রম চলছে। কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি জামিন পেয়ে মুক্তি পেলেও, অন্যরা এখনো বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে আটক রয়েছেন।
বৃটিশ হোম অফিসের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের তৈরি এ ধরনের প্রতিবেদন মূলত যুক্তরাজ্যে অভিবাসন, আশ্রয় ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আবেদন মূল্যায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহায়তার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
তবে এই প্রতিবেদন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির আশ্রয় আবেদন মঞ্জুর বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নয়। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য ও বক্তব্য সংকলিত হয়েছে। প্রতিবেদনটির ভূমিকায়ও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানেই তার দেওয়া প্রতিটি তথ্যের প্রতি হোম অফিসের সমর্থন নয়; তথ্যগুলো অন্যান্য প্রকাশ্য উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের ৮৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে বিরোধী দলগুলোর কর্মকাণ্ডের সুযোগ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস এবং বহু পুরোনো মামলা প্রত্যাহারের তথ্য রয়েছে; অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, পুলিশের জবাবদিহি এবং সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগও স্পষ্ট।