Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ক্যানসার, পুরুষদের তুলনায় নারীদের আক্রান্তের হার বেশি

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫০ এএম

যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে ক্যানসার, পুরুষদের তুলনায় নারীদের আক্রান্তের হার বেশি

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যে ক্যানসার শনাক্তের হার বাড়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকেরা। ২০০০ সালের পর থেকে দেশটিতে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ক্যানসার শনাক্তের হার প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে বলে ওয়াশিংটন পোস্টের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বয়সের পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্যানসার শনাক্তের হার ৮৩ শতাংশ বেশি বলে প্রতিবেদনের সারাংশে দাবি করা হয়েছে। বিশেষ করে স্তন, থাইরয়েড ও কোলোরেক্টাল ক্যানসারের প্রবণতা নিয়ে গবেষকেরা অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। তবে নারী ও পুরুষের মধ্যে ৮৩ শতাংশ পার্থক্যের হিসাবটি মূল তথ্যসারণি থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত অনুসন্ধানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ক্যানসারের পরিবর্তিত প্রবণতা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণা ও সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে মিলেনিয়াল এবং অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রজন্মের মধ্যে কিছু ধরনের ক্যানসার আগের তুলনায় বেশি শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

গবেষকেরা বোঝার চেষ্টা করছেন, কেন আগের প্রজন্মের তুলনায় কিছু মানুষের অপেক্ষাকৃত কম বয়সে ক্যানসার শনাক্ত হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশদূষণ, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ, ঘুমের অনিয়ম এবং আধুনিক জীবনযাত্রার বিভিন্ন পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রাখছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে এসব সম্ভাব্য কারণের সবগুলোর সঙ্গে ক্যানসার বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্যানসার নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সাধারণভাবে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। ফলে বয়স্কদের তুলনায় তরুণদের সামগ্রিক ক্যানসার ঝুঁকি এখনো অনেক কম। কিন্তু কম বয়সীদের মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার বৃদ্ধির প্রবণতা চিকিৎসক ও গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে।

আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির গবেষকেরা ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, ৩৪ ধরনের প্রচলিত ক্যানসারের মধ্যে ১৭টির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত পরবর্তী জন্মপ্রজন্মগুলোতে আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়েছে। বিশেষ করে কিডনি, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র এবং পরিপাকতন্ত্রের কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

গবেষণায় জন্মপ্রজন্মভিত্তিক পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একই বয়সে বিভিন্ন সময়ে জন্ম নেওয়া মানুষের ক্যানসার শনাক্তের প্রবণতা তুলনা করেছেন গবেষকেরা। এতে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, নতুন প্রজন্মের মানুষেরা আগের প্রজন্মের তুলনায় ভিন্ন ধরনের পরিবেশগত বা জীবনযাত্রার ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন কি না।

নারীদের মধ্যে ক্যানসার শনাক্তের হার বেশি হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে স্তন ও থাইরয়েড ক্যানসার এই পার্থক্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব ধরনের ক্যানসারে নারীদের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় বেশি, এমন নয়। ক্যানসারের ধরন, বয়স এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নারী ও পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার হার ভিন্ন হতে পারে।

স্তন ক্যানসার নারীদের মধ্যে বহুল শনাক্ত হওয়া ক্যানসারগুলোর একটি। অন্যদিকে থাইরয়েড ক্যানসারও নারীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি শনাক্ত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে উন্নত পরীক্ষা ও রোগ শনাক্তের পদ্ধতির কারণে বেশি ক্যানসার ধরা পড়তে পারে। ফলে শনাক্তের হার বৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত রোগ বৃদ্ধি এবং পরীক্ষার প্রভাব আলাদাভাবে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

কোলোরেক্টাল ক্যানসার বা বৃহদন্ত্র ও মলাশয়ের ক্যানসার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এই ক্যানসারের হার বৃদ্ধির প্রবণতা আগের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকেরা এর পেছনে খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, অন্ত্রের জীবাণুর পরিবেশ এবং অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ অনুসন্ধান করছেন।

আধুনিক খাদ্যাভ্যাসকে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আল্ট্রা-প্রসেসড বা অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন।

এ ধরনের খাবারের সঙ্গে স্থূলতা, বিপাকীয় পরিবর্তন এবং অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য পরিবর্তনের সম্পর্ক থাকতে পারে। এসব পরিবর্তন কিছু ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত কি না, তা গবেষণার বিষয়। তবে শুধু প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার কারণেই তরুণদের মধ্যে ক্যানসার বাড়ছে, এমন সিদ্ধান্ত এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

পরিবেশে ছড়িয়ে থাকা কৃত্রিম রাসায়নিক পদার্থ নিয়েও গবেষণা চলছে। দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য, প্লাস্টিক এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ মানবদেহে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

বিশেষ করে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষণার আগ্রহ বেড়েছে। অত্যন্ত ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তবে এই কণাগুলো সরাসরি তরুণদের ক্যানসার বৃদ্ধির কারণ, এমন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ঘুমের অনিয়ম এবং শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ির পরিবর্তনও গবেষণার আওতায় রয়েছে। রাতের শিফটে কাজ, অনিয়মিত ঘুম এবং দীর্ঘ সময় কৃত্রিম আলোয় থাকার ফলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে।

গবেষকেরা এসব পরিবর্তনের সঙ্গে ক্যানসারের সম্ভাব্য সম্পর্ক পরীক্ষা করছেন। তবে সাধারণ ঘুমের অনিয়ম এবং নির্দিষ্ট ধরনের দীর্ঘমেয়াদি রাতের শিফটে কাজের ঝুঁকিকে একইভাবে বিবেচনা করা যায় না।

এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে বিভিন্ন পদার্থের সংস্পর্শ এবং শৈশবের পরিবেশগত পরিস্থিতি ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে কি না, সেটিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীদের আলোচনায় গর্ভাবস্থায় ব্যবহৃত কিছু পুরোনো ওষুধের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে সব ধরনের মাতৃকালীন ওষুধকে ক্যানসারের ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বন্ধ করারও ভিত্তি নেই।

গবেষকেরা মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবেশগত সংস্পর্শের সম্মিলিত প্রভাব বোঝার চেষ্টা করছেন। গবেষণার ভাষায় এই ধারণাকে বলা হয় এক্সপোজোম। এর মধ্যে গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে শৈশব, কৈশোর এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বিভিন্ন পরিবেশগত প্রভাব অন্তর্ভুক্ত থাকে।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে চান, দীর্ঘ সময় ধরে খাদ্যাভ্যাস, রাসায়নিক পদার্থ, দূষণ এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন মানুষের শরীরে কী ধরনের প্রভাব তৈরি করে। তবে এসব উপাদানের কোনটি কতটা দায়ী, তা নির্ধারণ করা জটিল।

এদিকে চিকিৎসকেরা তরুণদের ক্যানসারের সম্ভাব্য উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন, মলে রক্ত, অকারণ ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত কিংবা শরীরে নতুন কোনো চাকা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এসব উপসর্গ দেখা দিলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। বিভিন্ন সাধারণ রোগের কারণেও একই ধরনের উপসর্গ হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ ঝুঁকির নারীদের জন্য ৪০ বছর বয়স থেকে নিয়মিত ম্যামোগ্রাম পরীক্ষার সুপারিশ রয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ঝুঁকির প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৪৫ বছর বয়স থেকে কোলোরেক্টাল ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের সুপারিশ করা হয়।

তবে যাঁদের পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস রয়েছে কিংবা বিশেষ ঝুঁকির কারণ আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও আগে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে সবার জন্য একই ধরনের পরীক্ষা উপযুক্ত নয়।

গবেষকেরা জানিয়েছেন, তরুণদের মধ্যে কিছু ক্যানসারের হার বাড়লেও সব ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। কিছু ক্যানসারের হার কমেছে। আবার উন্নত চিকিৎসা, আগাম শনাক্তকরণ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুহারও কমেছে।

ফলে ক্যানসার শনাক্তের হার বৃদ্ধি এবং ক্যানসারে মৃত্যুর হার বৃদ্ধিকে এক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কোনো নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের মধ্যে বেশি ক্যানসার শনাক্ত হওয়া মানেই সেই বয়সের মানুষের মৃত্যুঝুঁকি একই হারে বেড়েছে, এমন নয়।

ওয়াশিংটন পোস্টের আলোচিত অনুসন্ধানটি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছিল। তাই এটিকে ২০২৬ সালের নতুন গবেষণা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। একইভাবে ২০০০ সালের পর থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধির হিসাব দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তন নির্দেশ করে, সাম্প্রতিক এক বছরের বৃদ্ধি নয়।

গবেষকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কিছু ক্যানসার বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। খাদ্যাভ্যাস, পরিবেশগত সংস্পর্শ, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

তবে এখন পর্যন্ত তরুণদের মধ্যে ক্যানসার বৃদ্ধির জন্য একক কোনো কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। বিজ্ঞানীরা এই পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ শনাক্ত এবং ভবিষ্যতে ঝুঁকি কমানোর উপায় খুঁজতে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার