বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকের কক্ষ থেকে বিলিং ডেস্কে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার, যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা ঋণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৯ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার বিল তৈরি, রোগীর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং বকেয়া চিকিৎসা ঋণ আদায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। চিকিৎসকের কক্ষে রোগীর কথোপকথন থেকে তথ্য সংগ্রহ, চিকিৎসাসেবার বিল নির্ধারণ এবং বকেয়া পরিশোধের বার্তা পাঠানোর কাজেও যুক্ত হচ্ছে এই প্রযুক্তি। এর মধ্যেই স্বাস্থ্যবিমার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন কমানোর কারণে আগামী বছরগুলোতে আরও বেশি মানুষ চিকিৎসার ঋণের চাপে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার বিল ও ঋণ আদায়ের প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পরিবর্তন আসছে। হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ, বিল প্রস্তুত এবং অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন সেবা ব্যবহার করছে।
আরবান ইনস্টিটিউট ও রবার্ট উড জনসন ফাউন্ডেশনের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্কের একজনের বেশি চিকিৎসাসংক্রান্ত ঋণ থাকার কথা জানিয়েছেন। স্বাস্থ্যবিমা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও প্রায় প্রতি চারজনের একজনের চিকিৎসার ঋণ রয়েছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিমা থাকলেও অনেক আমেরিকান চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে পারছেন না।
ন্যাশনাল কনজিউমার ল সেন্টারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এপ্রিল কুয়েনহফ বলেছেন, আগামী বছরগুলোতে স্বাস্থ্যবিমা থাকা এবং না থাকা উভয় ধরনের মানুষের চিকিৎসার ঋণ বাড়তে পারে। কারণ বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনায় চিকিৎসার খরচের বড় অংশ রোগীদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ বিমার খরচ বহন করতে না পেরে কভারেজ হারাতে পারেন। আবার কেউ নতুন কঠোর শর্ত পূরণ করতে না পারায় বিমার সুবিধা থেকে বাদ পড়তে পারেন। অন্যদিকে যাঁরা বিমা ধরে রাখতে পারবেন, তাঁদেরও বেশি ডিডাক্টিবল, কো-পে এবং নিজের পকেট থেকে অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্তও এই পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্টের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে ফেডারেল ব্যয় প্রায় এক লাখ কোটি ডলার কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর সঙ্গে ওবামাকেয়ারের স্বাস্থ্যবিমা বাজারে অতিরিক্ত ভর্তুকির মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যুক্ত হলে বিমাবিহীন মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেএফএফের হিসাব অনুযায়ী, এসব নীতিগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে ২০৩৪ সালের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ অতিরিক্ত মানুষ স্বাস্থ্যবিমার বাইরে চলে যেতে পারেন। তবে এটি ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস, ইতিমধ্যে বিমা হারানো মানুষের সংখ্যা নয়।
স্বাস্থ্যবিমাবিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়লে হাসপাতালের অনাদায়ী বিলও বাড়তে পারে। চিকিৎসা নেওয়ার পর রোগী অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে সেই খরচ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হয়। স্বাস্থ্য খাতে এই পরিস্থিতিকে অনাদায়ী চিকিৎসাসেবার ব্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
আরবান ইনস্টিটিউটের একটি হিসাবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যনীতি পরিবর্তনের ফলে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত অনাদায়ী চিকিৎসাসেবার ব্যয় ২৭ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আর্থিক চাপে থাকা হাসপাতালগুলো বকেয়া অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার চেষ্টা করতে পারে।
এই সুযোগে চিকিৎসার বিল ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বাড়ছে। এর মধ্যে রয়েছে সিডার নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যেটি হাসপাতাল ও চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের বিল তৈরি, রোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা পরিচালনায় প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
সিডারের প্রধান কৌশল কর্মকর্তা ডুগান উইঙ্কি জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যবিমাবিহীন এবং মেডিকেইড পাওয়ার যোগ্য রোগীদের নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি রোগীদের বিমা পাওয়ার যোগ্যতা যাচাই করার পাশাপাশি তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী বিল পরিশোধের সুবিধা সম্পর্কে জানায়।
সিডারের প্রযুক্তিতে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য ব্যবহার করে রোগীর বিল পরিশোধের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা হয়। এরপর সেই তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, একজন একক মায়ের ১০ হাজার ডলারের চিকিৎসার বিল এবং উচ্চ আয়ের একজন কর্মকর্তার ৫০ ডলারের কো-পে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়। রোগীর আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী যোগাযোগ ও পরিশোধের ব্যবস্থা আলাদা করার চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি।
সিডার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি কথোপকথন ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে, যার নাম কোরা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীরা চিকিৎসার বিল নিয়ে প্রশ্ন করতে এবং অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত তথ্য জানতে পারেন। এতে হাসপাতালের বিল বিভাগে সরাসরি ফোন করার প্রয়োজন কমানো সম্ভব বলে প্রতিষ্ঠানটির দাবি।
তবে রোগীর আর্থিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিভেদে আলাদা ছাড় নির্ধারণের বিষয়টি নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন এর আগে ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে পণ্য বা সেবার দাম নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চিকিৎসার বিল আদায়ে একই ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
এদিকে চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর কথোপকথন থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি তৈরি এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে বিল নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কিছু ব্যবস্থা চিকিৎসকের কক্ষে কথোপকথন শুনে তা লিখিত নথিতে রূপান্তর করে। পরে সেই নথি ও রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বিলের জন্য প্রয়োজনীয় কোডের পরামর্শ দেয়।
২০২৬ সালের বসন্তে ব্লু ক্রস ব্লু শিল্ড অ্যাসোসিয়েশনের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সন্তান জন্মদানের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য রোগীদের বিল দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। অথচ একই সময়ে রক্ত দেওয়ার হারে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি।
বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নথি তৈরি ও কোড নির্ধারণের ব্যবস্থা হাসপাতালের বিলের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তাদের আরেকটি বিশ্লেষণে দাবি করা হয়, এ ধরনের প্রযুক্তির কারণে এক বছরে স্বাস্থ্যসেবার খরচ অতিরিক্ত ১০০ কোটি ডলার বেড়েছে।
তবে হাসপাতালগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী আমেরিকান হসপিটাল অ্যাসোসিয়েশন এই ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য, বিলের কোড ব্যবহারের পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ থেকে হাসপাতালগুলো ভুলভাবে বিল তৈরি করছে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অযৌক্তিক খরচ বাড়ছে, তা প্রমাণিত হয় না।
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসার নথি তৈরির সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিলের নির্ভুলতা বাড়ানোর দাবি করছে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে চিকিৎসকপ্রতি বছরে অতিরিক্ত ১৩ হাজার ডলার আয় তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আরও নির্ভুলভাবে চিকিৎসাসেবার কোড নির্ধারণের মাধ্যমে এই আয় সম্ভব।
শুধু হাসপাতাল নয়, স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু বিমা প্রতিষ্ঠান অ্যালগরিদম ব্যবহার করে চিকিৎসাসেবার অনুমোদন বিলম্বিত কিংবা প্রত্যাখ্যান করছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা একইভাবে প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি মেডিকেয়ারও কিছু চিকিৎসাসেবার আগাম অনুমোদন যাচাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহৃত পদ্ধতির সঙ্গে এই উদ্যোগের মিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার বিল তৈরি থেকে বকেয়া অর্থ আদায় পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যবস্থাকে বিল ব্যবস্থাপনা সহজ করা এবং অর্থ আদায়ের কার্যকারিতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে রোগীদের আর্থিক চাপ, বিলের নির্ভুলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ভোক্তা অধিকারকর্মী ও স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান