বিজ্ঞাপন
ভিসার কড়াকড়িতে ব্রিটেনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি বন্ধের পথে
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪১ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্ধারিত সীমা কমিয়ে আনার পর বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করছে দেশটির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়। ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেলে বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগেভাগেই এ পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী ভিসার মোট আবেদনের ১০.৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ২.৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ছিল মাত্র ০.৪ শতাংশ।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে আবেদন প্রত্যাহারের হার ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের ৭.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের একই সময়ে ২৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০.৯ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হার ১.২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা হোম অফিস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ভিসা প্রত্যাখ্যানের সীমা ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছে। অর্থাৎ, সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের বেশি হলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, ভিসা প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সীমা অতিক্রমের ঝুঁকি এড়াতে তারা আগেভাগেই ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করছে। যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রস্তাব প্রয়োজন হওয়ায় প্রস্তাব বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার করতে হয়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের হোম অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। যেসব দেশের নাগরিকেরা শিক্ষার্থী ভিসা ব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন বলে সরকার সন্দেহ করছে, সেসব দেশের আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই বেশি হচ্ছে।
উচ্চশিক্ষা খাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ পুরোপুরি স্থগিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা এনরোলির তথ্যেও দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৫ শতাংশের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ডের উপাচার্য স্যার ডেভিড বেল বলেছেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করেছে। এ কারণে বেশি যাচাই-বাছাইয়ের মুখে থাকা দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ কমানো হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথের অভিযোগ, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ আগের তুলনায় অনেক কম অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ, অসংগতিপূর্ণ ও অতিরিক্ত ব্যক্তিনির্ভর যুক্তিতে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়োগের অনুমতি হারানোর ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যাপকভাবে ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে কয়েকটি বিতর্কিত ভিসা প্রত্যাখ্যানের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। কোনো কোনো শিক্ষার্থী আগে অন্য দেশে পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেছিলেন বলে তাদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রির ক্ষেত্রে এমন কোর্সের বিষয়বস্তু বলতে না পারার কারণেও আবেদন প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ঘটেছে, যেসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কোর্সে আদৌ ছিল না বলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি।
ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুইয়ার জানিয়েছেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে যাওয়ায় তার প্রতিষ্ঠান গত বছরের শেষ দিক থেকে কয়েকটি দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রস্তাব প্রত্যাহার শুরু করে। তিনি কিছু সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী ও যথাযথ তথ্যের অভাবনির্ভর বলে বর্ণনা করেছেন। তার উল্লেখ করা একটি ঘটনায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়টি নরউইচে অবস্থিত—এ তথ্যও বুঝতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে ভিসার কঠোর নিয়ম, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
ইউনিভার্সিটি অ্যালায়েন্সের প্রধান নির্বাহী ভেনেসা উইলসন সতর্ক করেছেন, এ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পুনর্গঠন, কর্মী ছাঁটাই এবং কোর্স ও ক্যাম্পাস বন্ধের মতো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য জেমস মিলারও বলেছেন, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত সীমার নিচে রাখতে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ বন্ধ করেছে। তার আশঙ্কা, চলতি বছরে অনেক প্রতিষ্ঠানে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ শতাংশেরও বেশি কমে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের হোম অফিস জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা দেশটির জন্য ইতিবাচক অবদান রাখেন। তবে অভিবাসনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষার্থী নিয়োগ করতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়া উন্নত করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করার কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।