Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নিচ্ছেন রেকর্ডসংখ্যক আমেরিকান, বাড়ছে বিকল্প পাসপোর্টের চাহিদা

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৯ এএম

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নিচ্ছেন রেকর্ডসংখ্যক আমেরিকান, বাড়ছে বিকল্প পাসপোর্টের চাহিদা

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিভাজন নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইউরোপের দেশ লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে আমেরিকানদের। অনেকেই দেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনই নিচ্ছেন না। বরং ভবিষ্যতে প্রয়োজনে ইউরোপে বসবাসের সুযোগ রাখতে দ্বিতীয় পাসপোর্ট সংগ্রহ করছেন। তাঁদের একটি বড় অংশের জন্য এই সুযোগ তৈরি হয়েছে পূর্বপুরুষের সূত্রে লুক্সেমবার্গের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকার কারণে।

লুক্সেমবার্গের জাতীয় নিবন্ধনের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ৩ হাজার ৫৭৪ জন আমেরিকান দেশটির নাগরিকত্ব পেয়েছেন। নাগরিকত্বের তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা। তবে দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৬৫৭ জন নতুন করে স্বেচ্ছায় আবেদন, নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার বা অন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লুক্সেমবার্গের নাগরিক হয়েছেন।

দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে পার্থক্যের কারণ নাগরিকত্ব পাওয়ার পদ্ধতি। জাতীয় নিবন্ধনে যাঁদের নাগরিক হিসেবে গণনা করা হয়েছে, তাঁদের সবাই ওই বছর নতুন করে আবেদন করে নাগরিকত্ব পাননি। তাঁদের অনেকেই আইন অনুযায়ী আগে থেকেই লুক্সেমবার্গের নাগরিক হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য ছিলেন। যেমন, জন্মের সময় বাবা বা মা লুক্সেমবার্গের নাগরিক হলে বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শর্ত পূরণ করে দেশটিতে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও নাগরিকত্বের বিধান রয়েছে।

তবে স্বেচ্ছায় আবেদন করে নাগরিকত্ব পাওয়া ৬৫৭ জনের সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এই বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে বিকল্প পাসপোর্টের প্রতি আগ্রহ বাড়ার একটি ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ডেনভারের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী ক্যারিস ক্যাসিডির অভিজ্ঞতায় এই প্রবণতার ব্যক্তিগত দিকটি উঠে এসেছে। তিনি একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী। ছোটবেলা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে ইউরোপে বসবাসের চিন্তা তাঁর মনে ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আগ্রহ আরও জোরালো হয়।

ক্যাসিডির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজন নতুন কিছু নয়। তবে দেশটিতে সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ ইউরোপের তুলনায় কম বলে তিনি মনে করেন। তাঁর ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করে নিজের অবস্থার উন্নতি করতে চাইলেও অনেক সময় বিপুল ঋণের বোঝা নিতে হয়, আবার কখনো বাসস্থান কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও কাটছাঁট করতে হয়।

অনলাইনে পারিবারিক ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে ক্যাসিডি জানতে পারেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের একজন ছিলেন লুক্সেমবার্গের বাসিন্দা। তাঁর পাঁচ প্রজন্ম আগের এক পূর্বপুরুষের সূত্র ধরে দেশটির নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ওই পূর্বপুরুষ ১৮১৫ সালের পর লুক্সেমবার্গে জন্মেছিলেন বলে নাগরিকত্বের জন্য প্রাসঙ্গিক বংশগত শর্তের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ইতিহাস মিলে যায়।

লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব আইনে নির্দিষ্ট বংশধারার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এর জন্য পারিবারিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা এবং পূর্বপুরুষের জন্মসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে নারীরাও তাঁদের সন্তানদের নাগরিকত্বের অধিকার দিতে পারেন। ক্যাসিডিকে পারিবারিক নথি ও অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ করতে প্রায় এক বছর সময় দিতে হয়। তবে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য তাঁকে ভাষা পরীক্ষা দিতে হয়নি কিংবা লুক্সেমবার্গে গিয়েও আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়নি।

মার্চে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে সুইডেনে চলে যান। ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদ নিয়ে উদ্বেগের কারণেই দ্রুত দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তবে ইউরোপে কোথায় স্থায়ীভাবে থাকবেন, সে বিষয়ে তাঁর পরিকল্পনা তখনও চূড়ান্ত হয়নি।

লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব নিয়ে কাজ করা ড্যানিয়েল অ্যাটজও এই প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছেন। নেব্রাস্কায় জন্ম নেওয়া অ্যাটজ নিজেও পূর্বপুরুষের সূত্রে দেশটির নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তাঁর প্রপিতামহীর মা মার্গারিট ক্রুখটেন লুক্সেমবার্গে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি কানসাসে চলে যান।

২০০৮ সালে লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ব আইনে পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট শর্তে ১৯০০ সালের ১ জানুয়ারি জীবিত থাকা লুক্সেমবার্গের নাগরিক পূর্বপুরুষের বংশধরদের নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়। ২০১৭ সালে পাস হওয়া আরেকটি আইনে যোগ্য বংশধরদের জন্য একই ধরনের সুযোগ রাখা হয়েছিল, যার আবেদন করার সময়সীমা ছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

২০১৪ সালে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর অ্যাটজ লুক্সেমবার্গে তাঁর হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়দের খুঁজে পান। তাঁদের একজন অ্যানেটের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অ্যাটজের ভাষায়, এই নাগরিকত্ব তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্ববিষয়ক পরামর্শ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অন্য আমেরিকানদের আবেদনপ্রক্রিয়ায় সহায়তা করছেন।

অ্যাটজ জানান, ২০১৬ সালে ট্রাম্প প্রথমবার নির্বাচিত হওয়ার সময়ও লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্বের আবেদন বেড়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আগ্রহের মাত্রা আরও বেশি। তাঁর প্রতিষ্ঠানে ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর থেকে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর কর্মীর সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে ১৫ হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৯০০ আমেরিকান নাগরিকত্বপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন, যা মোট আবেদনকারীদের আনুমানিক ১৫ শতাংশ।

লুক্সেমবার্গ সরকারের অক্টোবরের শুরুতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লুক্সেমবার্গের নাগরিকের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৬৯০। প্রতিবেশী জার্মানিতে বসবাসরত নাগরিকের সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৯২৫। জুনের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লুক্সেমবার্গের নাগরিকের সংখ্যা ৯৫২ জন বেড়েছে।

তবে নাগরিকত্ব নেওয়া মানেই লুক্সেমবার্গে চলে যাওয়া নয়। অ্যাটজের মতে, তাঁদের অধিকাংশই দেশটিতে বসবাসের পরিকল্পনা করছেন না। অনেকেই স্পেন, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশকে বসবাসের জন্য বেছে নিচ্ছেন। লুক্সেমবার্গে জীবনযাত্রার ব্যয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের তুলনায় প্রায় ৫১ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি কাজের সুযোগও সবার পেশাগত চাহিদার সঙ্গে মেলে না।

ক্যাসিডিও ভবিষ্যতে লুক্সেমবার্গে থাকার কথা ভাবছেন, তবে আর্থিক দিক থেকে তা কতটা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে তিনি জানান, নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসেনি। ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের কারণে বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাঁর কাছে কিছুটা ভীতিকর বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবু যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা পুরোপুরি হারাননি ক্যাসিডি। তাঁর মতে, দেশটিতে অনেক কঠিন ঘটনা ঘটলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রাম্পের প্রশাসনের বাকি সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সব মিলিয়ে, লুক্সেমবার্গের নাগরিকত্বের প্রতি আমেরিকানদের আগ্রহ কেবল দেশত্যাগের প্রবণতা নয়; অনেকের কাছে এটি ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় একটি বিকল্প ব্যবস্থা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকত্বের সুযোগ থাকায় তাঁরা প্রয়োজনে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস ও কাজের পথ খোলা রাখতে চাইছেন।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার