বিজ্ঞাপন
ডাউন সিনড্রোমের জন্য দায়ী অতিরিক্ত ক্রোমোজোম মানবকোষ থেকে সরালেন বিজ্ঞানীরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৬ এএম
বিজ্ঞাপন
জাপানের মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ক্রিসপার ক্যাস৯ জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডাউন সিনড্রোম থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া মানবকোষে অতিরিক্ত ২১ নম্বর ক্রোমোজোম সরাতে সক্ষম হয়েছেন। রিয়োতারো হাশিজুমের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পিএনএএস নেক্সাস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এটি শরীরের বাইরে পরীক্ষাগারে কোষের ওপর পরিচালিত গবেষণা। কোনো মানুষের শরীরে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে ডাউন সিনড্রোমের চিকিৎসা করা হয়নি।
ট্রাইসোমি ২১ অবস্থায় সাধারণ দুটি কপির পরিবর্তে কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের তিনটি কপি থাকে। এই অতিরিক্ত জিনগত উপাদান ডাউন সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত বিকাশগত পার্থক্য ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত জটিলতার কারণ। গবেষকেরা আলাদা কোনো জিনের পরিবর্তন করার পরিবর্তে তিনটি ক্রোমোজোমের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি কপি সরানোর পদ্ধতি পরীক্ষা করেছেন।
মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ক্রোমোজোম অপসারণের হার সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। এই হার পরীক্ষাগারের কোষে পাওয়া ফলাফল। এটি মানুষের চিকিৎসায় সাফল্যের হার নয় এবং পরীক্ষার সব কোষ থেকেই অতিরিক্ত ক্রোমোজোম সরানো সম্ভব হয়নি।
গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে ডাউন সিনড্রোম থাকা ব্যক্তির ত্বক থেকে নেওয়া ফাইব্রোব্লাস্ট কোষ এবং সেগুলো থেকে তৈরি আইপিএস কোষ। আইপিএস হলো পরীক্ষাগারে পুনঃপ্রোগ্রাম করা এমন স্টেম সেল, যা বিভিন্ন ধরনের কোষে পরিণত হতে পারে। গবেষকেরা জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট ক্রোমোজোম কপিকে শনাক্ত করার উপযোগী নির্দেশক তৈরি করেন। এরপর ক্রিসপার ক্যাস৯ ব্যবস্থার সাহায্যে সেই ক্রোমোজোমের একাধিক স্থানে কাটার মাধ্যমে সেটি অপসারণের চেষ্টা করেন।
পদ্ধতিটির বিশেষ দিক হলো তিনটি কপির সবগুলোকে নির্বিচারে লক্ষ্য না করে নির্দিষ্ট একটি কপিকে লক্ষ্যবস্তু করা। গবেষণাপত্রে এই কৌশলকে অ্যালিল স্পেসিফিক পদ্ধতি বলা হয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, স্টেম সেলের পাশাপাশি পরিণত ফাইব্রোব্লাস্ট এবং বিভাজন না হওয়া কোষেও এই কৌশলে ক্রোমোজোম অপসারণ সম্ভব হয়েছে।
অতিরিক্ত ক্রোমোজোম সরানো কোষে কিছু কার্যগত পরিবর্তনও পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব কোষে জিনের সক্রিয়তার ধরন, কোষের বৃদ্ধির গতি এবং ক্ষতিকর সক্রিয় অক্সিজেন মোকাবিলার সক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থার দিকে ফিরেছে। তবে কোষের এই পরিবর্তন থেকে মানুষের বিকাশগত বৈশিষ্ট্য বা স্বাস্থ্যগত জটিলতা একইভাবে বদলে যাবে, এমন সিদ্ধান্ত এই গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশোধিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লক্ষ্য করা ক্রোমোজোমটি অপসারিত না হলে সেটিতে ডিএনএর অংশ বাদ পড়া, যুক্ত হওয়া কিংবা উল্টোভাবে বিন্যস্ত হওয়ার মতো পরিবর্তন ঘটতে পারে। ডিএনএর দুই সুতো কাটার সঙ্গে এসব ঝুঁকি সম্পর্কিত। গবেষকেরা তাই ভবিষ্যতে ক্রোমোজোম না কেটে সেটি অপসারণের আরও নিরাপদ পদ্ধতি তৈরির প্রয়োজন তুলে ধরেছেন।
এই কাজকে ইতিহাসে প্রথমবার সম্পূর্ণ ক্রোমোজোম সরানোর ঘটনা বলা যথাযথ নয়। গবেষণাপত্রেই ক্রিসপার ব্যবহার করে পুরো ক্রোমোজোম অপসারণের আগের গবেষণার উল্লেখ রয়েছে। নতুন গবেষণার গুরুত্ব হলো মানব ট্রাইসোমি ২১ কোষে নির্দিষ্ট একটি ক্রোমোজোম কপিকে বেছে অপসারণের কৌশল এবং তার কার্যকারিতা দেখানো।
মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্পষ্ট করেছে, এটি কোষ পর্যায়ে একটি ধারণার কার্যকারিতা প্রমাণের গবেষণা। ফলাফল ভবিষ্যতে ডাউন সিনড্রোমের সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতা নিয়ে গবেষণায় সহায়তা করতে পারে। তবে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে পদ্ধতিটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বর্তমানে এই গবেষণাকে ডাউন সিনড্রোম সারানোর চিকিৎসা হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই।