বিজ্ঞাপন
স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েতে কাঁদছেন আমেরিকান নারী
ইসলাম গ্রহণের পর পরিবার হারালেন
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২১ এএম
বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি আবেগঘন বক্তব্যকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেখানে অ্যালি নামের এক আমেরিকান নারীর কথা বলা হয়েছে। প্রচারিত দাবিতে বলা হচ্ছে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন, হিজাব পরা শুরু করেছেন এবং আবদুল নামের এক মুসলিম পুরুষকে বিয়ে করেছেন। পরে পরিবারের সদস্যরা তার নতুন ধর্মীয় পরিচয় মেনে নিতে পারেননি বলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে নিজের কষ্টের কথা জানিয়েছেন। আরও দাবি করা হচ্ছে, তার স্বামী পরে দ্বিতীয় একজন নারীকে বিয়ে করে তার সঙ্গে বসবাস করছেন।
তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত অ্যালির পূর্ণ পরিচয়, তার অবস্থান, স্বামীর পরিচয়, বিয়ের তথ্য কিংবা কথিত দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে যে উৎসটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পাওয়া গেছে, সেটিও মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একই বক্তব্যের পুনঃপ্রচার। ফলে অ্যালির ব্যক্তিগত জীবনের এসব দাবিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার দিক থেকে নিরাপদ নয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির কান্নার ভিডিও বা আবেগঘন বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তার সঙ্গে নানা ধরনের দাবি যুক্ত হয়ে যেতে পারে। মূল ভিডিও কোথা থেকে এসেছে, কখন ধারণ করা হয়েছে, কে ধারণ করেছে, বক্তব্যের আগে বা পরে কী ঘটেছিল এবং ভিডিওটি সম্পূর্ণ কি না, এসব তথ্য নিশ্চিত না করে শুধু একটি ছোট বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো ঘটনা নির্ধারণ করা কঠিন।
তবে অ্যালির কথিত অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মুসলিম ধর্মান্তরিত নারীর বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণকারী কিছু নারী জানিয়েছেন, নতুন ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের পর তাদের পরিবারকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে হয়েছে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে পরিবার বা বন্ধুমহলে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হিজাব পরার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে ধর্মীয় পরিচয়ের দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে ওঠে। ফলে পরিবার ও পরিচিতজনের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় আরও তীব্র হতে পারে।
অ্যাশলি বুনুরা নামে এক আমেরিকান ইসলাম গ্রহণকারী নারীর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত একটি পুরোনো সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, ইসলাম গ্রহণের পর তিনি পরিবার ও বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার ক্ষেত্রে মা, বোন ও দাদা শুরুতে কিছুটা উদ্বিগ্ন হলেও পরে তাকে সমর্থন করেছিলেন। তবে হিজাব পরার সিদ্ধান্তের কারণে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণকারী প্রত্যেক নারীর অভিজ্ঞতা এক নয়। কারও পরিবার সময়ের সঙ্গে বিষয়টি গ্রহণ করে, আবার কারও ক্ষেত্রে সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আরেকটি গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণকারী নারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা হয়েছিল। সেখানে কয়েকজন নারী জানিয়েছেন, ধর্ম পরিবর্তনের পর পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠেছিল। একজন নারী জানিয়েছেন, হিজাব পরার কারণে তার বাবা জনসমক্ষে তার সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন না এবং ধর্ম নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। আরেকজনের ক্ষেত্রে বিয়ের পর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তন কখনও কখনও পারিবারিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ইসলাম গ্রহণের পর হিজাব পরাকে কেন্দ্র করেও অনেক নারী মানসিক চাপের মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম নারীদের নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, হিজাব অনেকের কাছে ধর্মীয় বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও একই সঙ্গে এটি তাদের পরিচয়কে প্রকাশ্যে দৃশ্যমান করে তোলে। ফলে কর্মক্ষেত্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা অপরিচিত মানুষের কাছ থেকেও নানা ধরনের প্রশ্ন বা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে।
তবে অ্যালির কথিত গল্পের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়েছে, আবদুল এখন তার দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে বসবাস করছেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য নথি, সাক্ষাৎকার, আদালতের তথ্য বা স্বাধীন সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে এটি সত্য ঘটনা, অসম্পূর্ণ ঘটনা, পুরোনো ঘটনা নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করা একটি গল্প, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিবাহসংক্রান্ত অভিযোগ খুব সহজেই একজন মানুষের সামাজিক পরিচয় এবং পারিবারিক জীবনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিয়ে, পরিত্যাগ বা পারিবারিক অবহেলার মতো দাবি প্রকাশ করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
ইসলাম গ্রহণের বিষয়টিও এখানে আলাদা করে দেখা দরকার। কোনো নারী ইসলাম গ্রহণ করলে সেটি তার ব্যক্তিগত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত। একইভাবে পরিবারের অন্য সদস্যরা ভিন্ন ধর্মে থাকলেও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা বা না রাখার বিষয়টি পারিবারিক পরিস্থিতি, ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং পারস্পরিক আচরণের ওপর নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রে ইসলাম গ্রহণকারী নারীদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় যেমন পারিবারিক বিরোধের ঘটনা রয়েছে, তেমনি পরিবার থেকে পূর্ণ সমর্থন পাওয়ার ঘটনাও রয়েছে।
এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অ্যালির কথিত বক্তব্যকে ব্যবহার করে পুরো মুসলিম সমাজ, আমেরিকান পরিবার কিংবা আন্তধর্মীয় বিয়েকে একটি নির্দিষ্ট ধারণায় বিচার করা ঠিক হবে না। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কখনোই একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক চিত্র নয়।
এ ধরনের ঘটনা সামনে এলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং তার নিজের বক্তব্যকে সম্মান করা। পরিবার যদি ধর্মীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পারে, তাহলে সম্পর্কের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হতে পারে। আবার সময়ের সঙ্গে অনেক পরিবার সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। ধর্ম পরিবর্তনের পর নতুন সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।
পুরোনো একটি আমেরিকান ইসলাম গ্রহণের গল্পেও দেখা যায়, পরিবারের বিরোধিতা ও সামাজিক একাকিত্ব একজন নতুন মুসলিম নারীর জীবনে বড় ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে অনেক নারী আবার নতুন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সহায়তার মাধ্যমে নিজেদের নতুন জীবন গড়ে তুলেছেন।
সুতরাং অ্যালিকে ঘিরে ভাইরাল হওয়া গল্পের ক্ষেত্রে আপাতত সবচেয়ে দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হলো এটিকে যাচাই না হওয়া ব্যক্তিগত দাবি হিসেবে দেখা। তিনি সত্যিই ইসলাম গ্রহণ করেছেন কি না, তার পরিবারের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছে, আবদুল নামে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল কি না এবং স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনা সত্য কি না, এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়ার জন্য মূল ভিডিও, অ্যালির নিজস্ব বক্তব্য এবং স্বাধীন সূত্র প্রয়োজন।