বিজ্ঞাপন
ছয় কারণে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে ৬ কোটি বাংলাদেশি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে গত এক বছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সময়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে থাকা প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষও দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক।
মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট: মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত চার বছরে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮০ লাখ। ২০২২ সালে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে মোট দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, নিম্ন মধ্যবিত্তদের বড় একটি অংশকে দারিদ্র্যের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দিতে না পারলে বাংলাদেশকে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
ছয় কারণ
বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ার পেছনে ছয়টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। এগুলো হলো—কোভিড-১৯ মহামারি, জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কর ও ভর্তুকি ব্যবস্থার দুর্বলতা।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। অনেকে চাকরি হারান। পরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, করোনাকালে চাকরি হারানো অনেক মানুষ পরে আনুষ্ঠানিক খাতে আর ফিরতে পারেননি। একই সময়ে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংক খাতের সংকট অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট শিল্প উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। এতে নতুন করে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
মূল্যস্ফীতির চাপ
বাংলাদেশে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গত দুই বছরে কিছুটা কমে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এলেও তা এখনো সহনীয় পর্যায়ে আসেনি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে; কেউ কেউ সম্পদ বিক্রি করেও ব্যয় মেটাচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক বলছে, আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দুর্বল কর ব্যবস্থাও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। কর প্রশাসনের দুর্বলতা কাটিয়ে রাজস্ব বাড়াতে ডিজিটালাইজেশন, সমন্বিত করদাতা ডেটাবেস ও কর পরিপালন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ধনীরা বেশি সুবিধা পাচ্ছে
দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও বিভিন্ন ভর্তুকির সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশের প্রায় ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ প্রধান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা পান না। যারা পান, তাদের প্রাপ্ত সুবিধার পরিমাণও ধনীদের তুলনায় কম।
দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ বছরে গড়ে ৭ হাজার ১৪০ টাকা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষ পান ১০ হাজার ৪৭২ টাকা।
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় ধনীরা ভর্তুকির বড় অংশ পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ মানুষের জন্যই বিদ্যুৎ ভর্তুকির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলেন, ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে দরিদ্রদের লক্ষ্য করে কর্মসূচি নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা যথাযথ ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাতে পারলে বছরে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে। বর্তমান ব্যবস্থায় এ সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ হতে পারে।
প্রবৃদ্ধিও কমছে
দারিদ্র্য বাড়ার সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ দশমিক ২২ শতাংশে দাঁড়ায়।
চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। দীর্ঘদিন দারিদ্র্য কমার ধারায় থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে আবার তা বাড়তে শুরু করেছে।
সরকারের বক্তব্য
সরকার বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের বড় একটি অংশ আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া এবং কিছু সংকটের পেছনে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও দায়ী।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সমস্যাগুলো আগের সরকারগুলোর কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণেও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কারসংক্রান্ত পরামর্শগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা