Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তান ভেঙে ৪ প্রদেশ গড়ার পরিকল্পনা সেনাপ্রধানের

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম

পাকিস্তান ভেঙে ৪ প্রদেশ গড়ার পরিকল্পনা সেনাপ্রধানের

বিজ্ঞাপন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে পাকিস্তানে চলছে ব্যপক উত্তেজনা। এরই মধ্যে দেশটিকে চার ভাগে ভেঙে ছোট ছোট প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা করছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বলদে যাবে পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো। ক্ষমতা কমে যেতে পারে পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর।

ইমরান খান কারাগারে রয়েছেন এবং তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআইয়ের সমর্থকদের বিক্ষভে উত্তাল দেশটি। এছাড়া তাকে সমর্থন জানাতে রাজধানী ইসলামাবাদে বিক্ষোভ মিছিলে ঘোষণা দিয়েছে।

তবে সরকার বিক্ষোভ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেয়। ইসলামাবাদের বিভিন্ন সড়কে দুই হাজারের বেশি কনটেইনার বসিয়ে রাস্তা বন্ধ করা হয়।

৪ অক্টোবর শেষ পর্যন্ত পিটিআইয়ের সমর্থকেরা মিছিল শুরু করেন। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের লাক্কি মারওয়াত থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ যাত্রা শুরু করেন।

তাদের লক্ষ্য ছিল পথে আরও সমর্থক জড়ো করা। তবে শেষ পর্যন্ত তারা ইসলামাবাদে যাবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত তখনো চূড়ান্ত হয়নি।

নেপথ্যে আরও বড় পরিকল্পনা

ইমরান খানকে ঘিরে এই রাজনৈতিক উত্তেজনার আড়ালেই পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামো বদলের উদ্যোগ চলছে। প্রধান পরিকল্পনাটি হলো বর্তমান চারটি প্রদেশকে আরও ছোট কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা। সমর্থকদের যুক্তি, বর্তমান প্রদেশগুলো আয়তন ও জনসংখ্যায় অনেক বড়। ফলে স্থানীয় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তবে বিরোধীদের আশঙ্কা, এর আসল উদ্দেশ্য প্রশাসনিক সংস্কার নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশগুলোতে প্রভাব ধরে রাখা রাজনৈতিক পরিবারগুলোর ক্ষমতা কমানো।

পাকিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশগুলোর একটি পাঞ্জাব। দেশটির সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার এই প্রদেশে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস করেন।

দীর্ঘদিন ধরে পাঞ্জাবের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শরীফ পরিবার। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এই পরিবারের সদস্য। তার ভাই নওয়াজ শরীফও একাধিকবার দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বর্তমানে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ।

অন্যদিকে সিন্ধু প্রদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী ভুট্টো পরিবার। পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপির মাধ্যমে এই পরিবার সিন্ধুর রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এই পরিবারের সঙ্গে যুক্ত। তার ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিকেও ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতা হিসেবে দেখা হয়।

পরিকল্পনার সমর্থকেরা বলছেন, বড় প্রদেশে প্রশাসন পরিচালনা কঠিন। দুর্নীতি ও দুর্বল স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষও ভোগান্তিতে পড়ছেন। পাঞ্জাবের গ্রামীণ এলাকার অনেক মানুষকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, ছোট প্রদেশ তৈরি করলেই এসব সমস্যা সমাধান হবে না। তাদের আশঙ্কা, নতুন প্রদেশ তৈরি হলে নতুন প্রশাসনিক পদ সৃষ্টি হবে। এতে সরকারি ব্যয় বাড়তে পারে এবং রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের জন্য নতুন পদ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সেনাবাহিনীর ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

প্রদেশ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে।

গত দুই বছরে পাকিস্তানের সংবিধানে দুই দফা বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এ ছাড়া নতুন ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট বা এফসিসি গঠন করা হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই আদালতে সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রভাব রয়েছে।

পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর বাইরেও প্রভাব বেড়েছে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফকে অনেকেই সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নেতা হিসেবে দেখেন।

অর্থনৈতিক সংকটও বড় কারণ

রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটও এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৩ শতাংশ।

ঋণ পরিশোধ ও সরকারি ব্যয়ের পর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে উন্নয়ন বা অন্যান্য খাতে ব্যয়ের জন্য খুব বেশি অর্থ থাকছে না। জ্বালানি ও কর বাড়ানো নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তান কিছু সাফল্য পেলেও দেশের ভেতরে বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই সাফল্য ধরে রাখতে পারছে না।

বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব

পাকিস্তানের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রদেশ ভাগ করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। এ কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সহজ নয়।

পাঞ্জাবের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তি হয়তো শেষ পর্যন্ত এতে সম্মত হতে পারে। কিন্তু সিন্ধুর পিপিপির জন্য বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সিন্ধু প্রদেশই দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি।

এরই মধ্যে সিন্ধু বিধানসভা প্রদেশ ভাগের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে একটি প্রস্তাবও পাস করেছে।

কারাগারে থাকলেও ইমরান এখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যাপক জনপ্রিয়। পিটিআইয়ের সমর্থকেরা তাকে মুক্ত করার দাবিতে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করছেন।

ফলে প্রদেশ পুনর্গঠন বা ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তনের মতো বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে নতুন করে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রদেশ পুনর্গঠনের বিতর্ক পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার