বিজ্ঞাপন
ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, কিন্তু বিশ্বজুড়ে ‘অপ্রতিরোধ্য ট্রাম্পবাদ’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দেশে রাজনৈতিক চাপে থাকলেও তার রক্ষণশীল পপুলিস্ট জাতীয়তাবাদের প্রভাব বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা, বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান সেই প্রবণতাকেই সামনে আনছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রথম দফার নির্বাচনে চমকপ্রদ সাফল্য এ প্রবণতার সর্বশেষ উদাহরণ। গত রোববারের ভোটে তার এই উত্থান পশ্চিম গোলার্ধে ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে আরও জোরালো করেছে।
জার্মানিতে অভিবাসনবিরোধী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি জাতীয় পর্যায়ে বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। ফ্রান্সে ডানপন্থি নেতা মেরিন ল্য পেন আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন।
এসব দল সরাসরি ট্রাম্পের অনুকরণে গড়ে ওঠেনি। অনেক দলের উত্থান ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনেরও আগে। তবে ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসা এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা তাদের অনুপ্রাণিত করছে। ট্রাম্প প্রশাসনও ইউরোপের বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছে।
ফ্লাভিও বলসোনারো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সাবেক ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বড় ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে জইর বলসোনারো কারাগারে রয়েছেন।
এখন লুলার সামনে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য মাত্র তিন সপ্তাহ সময় রয়েছে। তিনি জয়ী হতে না পারলে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে জনবহুল গণতন্ত্র আরও ডানদিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
ব্রাজিলের নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রভাবও স্পষ্ট। মার্কিন সিনেটর জিন শাহিন, টিম কেইন ও পিটার ওয়েলচ গত মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে ব্যবহার করে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছে।
এদিকে রোববারের নির্বাচনের পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি ব্রাজিলে ১২ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ভোট দেওয়ার পর একই দিনে ফল প্রকাশের বিষয়টি তুলে ধরে মার্কিন নির্বাচনী ব্যবস্থার সমালোচনা করেন।
লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোতেও ডানপন্থি শক্তির উত্থান ঘটছে। কলম্বিয়ায় ডানপন্থি নেতা আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা এ বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। কোস্টারিকায় পপুলিস্ট নেতা লরা ফার্নান্দেজ দেলগাদোর জয়ের পর দেশটিতেও ট্রাম্পঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এল সালভাদর, চিলি ও হন্ডুরাসেও রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় রয়েছে।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্প আর্জেন্টিনার জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের মুদ্রা বিনিময় চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যা দেশটির আইনসভা নির্বাচনে মিলেইর দলের পক্ষে ভোট দেওয়ার সঙ্গে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত ছিল।
ইউরোপেও ডানপন্থার ঢেউ
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সে মেরিন ল্য পেনের উত্থান আগামী বছর ইউরোপের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ব্যর্থ হলেও এবার তিনি আগের তুলনায় শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
ফ্রান্সের দুই দফার নির্বাচনী ব্যবস্থায় অতীতে মধ্যপন্থি দলগুলো ল্য পেনকে ঠেকাতে একজোট হয়েছে। কিন্তু মধ্য-ডান ও মধ্য-বাম রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
ল্য পেন তার ন্যাশনাল র্যালি দলকে আগের তুলনায় মধ্যপন্থি করার চেষ্টা করলেও জাতীয়তাবাদ, অভিবাসনবিরোধিতা, সুরক্ষাবাদী অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি বিরোধিতার অবস্থান ধরে রেখেছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হলে আধুনিক ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট হতে পারেন।
জার্মানির এএফডি নিয়ে ইউরোপের মধ্যপন্থি নেতাদের উদ্বেগ আরও বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসিবাদের ইতিহাসের কারণে জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থার উত্থান বিশেষভাবে সংবেদনশীল বিষয়।
গত বছর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মিউনিখে এএফডি নেতা অ্যালিস ভাইডেলের সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন। গত মাসে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে এএফডির বড় জয়ের পর ট্রাম্পও দলটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের সব রাজনৈতিক মিত্র সফল হননি। ট্রাম্পের সমর্থন সত্ত্বেও হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের ডানপন্থি নেতা ভিক্টর অরবান এ বছর ক্ষমতা হারিয়েছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গেও ট্রাম্পের সম্পর্ক ইরান যুদ্ধ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবিরোধকে কেন্দ্র করে শীতল হয়েছে।
পাল্টা জনতুষ্টিবাদের উত্থান
ট্রাম্পধারার পপুলিজমের বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক আন্দোলনও গড়ে উঠছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ট্রাম্পের কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোর অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বে উঠে এসেছেন।
কার্নি বলেছিলেন, বিশ্বে যখন জনতুষ্টিবাদ ও জাতিগত জাতীয়তাবাদ বাড়ছে, তখন কানাডা দেখাতে পারে যে বৈচিত্র্য দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি মোকাবিলার চেষ্টা করছেন। লেবার পার্টির সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে তিনি শিল্পোৎপাদন কমে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ ও বেসরকারীকরণের মতো নীতিকে দায়ী করেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্পবাদের বিরুদ্ধে বামপন্থি জনতুষ্টিবাদের উত্থানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাথমিক ভোটে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের সাফল্য সেই প্রবণতাকে সামনে এনেছে।
স্থায়ী রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ে উঠছে?
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে বৈশ্বিক জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনের নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০১৬ সালে ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভোটকেও তিনি নিজের রাজনৈতিক উত্থানের পূর্বাভাস হিসেবে দেখিয়েছিলেন।
তবে বিশ্বের ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদ এখন আর শুধু ট্রাম্পের ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট এ আন্দোলনের নিজস্ব ভিত্তি তৈরি করেছে।
ফলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কমলেও তার ধাঁচের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি যে সহজে হারিয়ে যাবে, এমন কোনো লক্ষণ নেই। বরং বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদের পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে বাম ও মধ্যপন্থি পাল্টা আন্দোলনও শক্তিশালী হচ্ছে।