বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্কের ব্যয়বহুল জীবন ছেড়ে ইতালিতে ১৩ হাজার ডলারে বাড়ি, নতুন ঠিকানায় মার্কিন দম্পতি
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ এএম
বিজ্ঞাপন
সাফল্যের মাপকাঠি বলতে বড় বাড়ি, নতুন গাড়ি আর ব্যস্ত শিডিউল—যুক্তরাষ্ট্রে বড় হওয়া অনেকের মতোই এমন ধারণার মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলেন মার্কিন দম্পতি অ্যালেক্স নিনম্যান ও তাঁর স্ত্রী। কিন্তু একটা সময় গিয়ে তাঁরা উপলব্ধি করেন, এসবের কোনোটিই আসলে তাঁদের সুখী করছে না।
তাই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে ২০১৯ সালে নিউইয়র্ক শহর ছেড়ে ইউরোপে পাড়ি জমান তাঁরা। এরপর ২০২০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে থাকার সময় কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে তাঁরা ইতালির আব্রুজ্জো অঞ্চলের একটি ছোট গ্রামে বসবাস করছেন, যা রাজধানী রোম থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। নিউইয়র্কের মতো ব্যয়বহুল শহর ছেড়ে ইতালির এই অপরিচিত গ্রামে মাত্র ১৩ হাজার ১০০ ডলারে বাড়ি কিনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনধারার সূচনা করেছেন এই দম্পতি।
ইতালির এই ছোট গ্রামে বসবাস করার সুবাদে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গৃহঋণের বিশাল আর্থিক বোঝা কাঁধে নিতে হয়নি তাঁদের। নগদ মাত্র ১১ হাজার ৫০০ ইউরো বা প্রায় ১৩ হাজার ১০০ ডলারের বিনিময়ে ১০৭৬ বর্গফুটের দোতলা একটি বাড়ি কিনেছেন তাঁরা। বাড়িটির বেজমেন্ট ও চিলেকোঠায় রয়েছে আরও দুটি ঘর।
বাড়িটি সংস্কারের পেছনে পরবর্তীতে আরও প্রায় ১৭ হাজার ১০০ ডলার ব্যয় করেছেন এই দম্পতি। তাঁরা জানিয়েছেন, কেবল আর্থিক সুবিধার জন্যই নয়, বরং একটি নিবিড় সামাজিক বন্ধন ও সম্প্রদায়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাঁরা এখানে স্থায়ী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইতালিতে খাবার, শিশুদের লালনপালনসহ দৈনন্দিন অন্যান্য খরচ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেকটাই কম। জীবনযাত্রার এই স্বল্প ব্যয়ের কারণে বেশি আয়ের পেছনে ছোটার চাপ কমেছে তাঁদের। প্রথমদিকে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নিউইয়র্কের টেক স্টার্টআপের চাকরিটি চালিয়ে গেলেও, গুছিয়ে ওঠার পর সেটি ছেড়ে দেন স্ত্রী।
বর্তমানে তিনি একটি ইতালিয়ান ট্রাভেল কোম্পানির মার্কেটিংয়ের কাজ ও কন্টেন্ট তৈরি করছেন। সেখানে আয় কিছুটা কম হলেও কাজের দারুণ স্বাধীনতা রয়েছে। ফলে পাঁচ বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে নিশ্চিন্তে সময় কাটানোর পাশাপাশি নতুন নতুন জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইতালির এই গ্রামের সামাজিক বন্ধনও বেশ দৃঢ়। এখানে প্রতিবেশীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করেন, হঠাৎ করেই খোঁজখবর নিতে বাড়িতে চলে আসেন, যাকে কেউ অনুপ্রবেশ বা বিরক্তি হিসেবে দেখে না। গ্রীষ্মের ছুটিতে এখানকার সমাজজীবনের আসল রূপ ফুটে ওঠে।
রাতের খাবারের পর পরিবারের সবাই পিয়াজ্জায় (জনসমাগমের জায়গা) জড়ো হয়, আর বাচ্চারা নিরাপদে সারা গ্রামজুড়ে খেলাধুলা করে। রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত বাচ্চাদের বাইরে থাকাটা এখানে খুবই স্বাভাবিক। তাঁদের মেয়ে এরই মধ্যে ইংরেজি, চেক এবং ইতালীয় ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় উপভাষাও শিখতে শুরু করেছে, যা তাকে স্থানীয় সংস্কৃতিরই একটি অংশে পরিণত করছে।
অবশ্য ইতালির এই জীবনও পুরোপুরি নিখুঁত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবার ও বন্ধুদের শূন্যতা তাঁরা প্রতিনিয়ত অনুভব করেন। এছাড়া ইতালির মন্থর গতির আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও কখনো কখনো হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়; যেমন, বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ নিতে গিয়েও স্বাস্থ্যবিমার কার্ডের কপি জমা দিতে হয়েছে তাঁদের!
তা সত্ত্বেও, এই দম্পতির মতে তাঁরা এমন কিছু অর্জন করেছেন যা হয়তো অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা কঠিন। এখন তাঁদের দৈনন্দিন জীবন বস্তুগত অর্জনের চেয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক ও আনন্দের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আব্রুজ্জোর এই ছোট গ্রামটিতে তাঁরা কেবল একটি বাড়িই কেনেননি, বরং নিজেদের এবং সন্তানের জন্য খুঁজে পেয়েছেন এক অমূল্য শান্তির নীড়।