বিজ্ঞাপন
কলেজে না পড়েও যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ২ লাখ ডলার আয়, খুলছে নতুন ক্যারিয়ার পথ
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৯ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রে চার বছরের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না থাকলেও ভালো আয় এবং স্থায়ী পেশাজীবন গড়ার সুযোগ রয়েছে। দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা থাকলে কিছু পেশায় ধাপে ধাপে উন্নতি করে বছরে এক লাখ থেকে দুই লাখ ডলার বা তারও বেশি আয় করা সম্ভব। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ফাস্টফুড ও খাবারের দোকান পরিচালনার কাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের ৪ অক্টোবর ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির কয়েকটি বড় খাবারের দোকান প্রতিষ্ঠানে সাধারণ কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে ধীরে ধীরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে উঠে উচ্চ আয় করা সম্ভব। তবে শুরুতেই এত বেশি বেতন পাওয়া যায় না। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, নেতৃত্বের যোগ্যতা এবং পদোন্নতির মাধ্যমে একজন কর্মী দোকান ব্যবস্থাপকের পদে পৌঁছালে আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন-এন-আউট প্রতিষ্ঠানের দোকান ব্যবস্থাপকদের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ২ লাখ ডলার পর্যন্ত হতে পারে। পান্ডা এক্সপ্রেসের দোকান ব্যবস্থাপকদের আয় প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ডলার, চিপোটলের প্রায় ৯৩ হাজার ডলার এবং টাকো বেলের প্রায় ৭৫ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভর করে অতিরিক্ত পুরস্কার বা প্রণোদনা যুক্ত হলে মোট আয় আরও বাড়তে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি। ফাস্টফুডের সাধারণ কর্মীরা বছরে ২ লাখ ডলার আয় করেন না। এই ধরনের উচ্চ আয় মূলত ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছানো কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ একজন নতুন কর্মী সাধারণত কম বেতন দিয়ে কাজ শুরু করেন এবং অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জনের পর ধাপে ধাপে উচ্চ পদে যেতে পারেন।
এই খাতে একজন কর্মীর কর্মজীবনের শুরু হতে পারে খাবার প্রস্তুত করা, গ্রাহকের কাছ থেকে অর্ডার নেওয়া, দোকান পরিষ্কার রাখা বা অন্যান্য সাধারণ দায়িত্ব দিয়ে। এরপর ভালো কাজের ভিত্তিতে তিনি দলনেতার দায়িত্ব পেতে পারেন। পরবর্তী সময়ে সহকারী ব্যবস্থাপক এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ব্যবস্থাপক বা দোকান ব্যবস্থাপক হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
সাধারণ কর্মী থেকে দলনেতা হতে প্রায় ছয় থেকে ১৮ মাস সময় লাগতে পারে। এরপর দলনেতা থেকে সহকারী ব্যবস্থাপক হতে এক থেকে দুই বছর এবং সহকারী ব্যবস্থাপক থেকে সাধারণ ব্যবস্থাপক হতে আরও দেড় থেকে তিন বছর সময় লাগতে পারে। তবে এই সময় নির্দিষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানের নিয়ম, কর্মীর যোগ্যতা, কাজের মান, অভিজ্ঞতা এবং খালি পদের ওপর পদোন্নতির সময় নির্ভর করে।
দোকান ব্যবস্থাপক হওয়ার জন্য শুধু পরিশ্রম করলেই হয় না। কর্মী পরিচালনা, গ্রাহকসেবা, পণ্য মজুত, কর্মীদের কাজের সময় নির্ধারণ, খাবারের অপচয় কমানো, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব বোঝার মতো দক্ষতা প্রয়োজন।
একজন সম্ভাব্য ব্যবস্থাপককে জানতে হয় কীভাবে নতুন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, কর্মী সংকটের মধ্যেও একটি কাজের পালা পরিচালনা করতে হয় এবং অসন্তুষ্ট গ্রাহকের অভিযোগ শান্তভাবে সমাধান করতে হয়। একই সঙ্গে কর্মীদের উৎসাহ দেওয়া, দুর্বল কর্মীদের উন্নত করা এবং একটি কার্যকর দল তৈরি করাও ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, একজন কর্মীর মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সম্ভাবনা থাকলে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। তাই শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট নয়। একজন কর্মী যদি অন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে পারেন, নতুন কর্মীদের কাজে দক্ষ করে তুলতে পারেন এবং নিজের অনুপস্থিতিতেও কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো সহকর্মী তৈরি করতে পারেন, তাহলে তার পদোন্নতির সম্ভাবনা বাড়ে।
যোগাযোগের দক্ষতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যস্ত পরিবেশে চাপ সামলে সহকর্মীদের সঙ্গে সঠিকভাবে কথা বলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা বোঝা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত জানানো একজন ব্যবস্থাপকের গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি শ্রম পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফাস্টফুড ও কাউন্টার কর্মীদের বড় অংশের ক্ষেত্রে আগে কোনো কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয় না। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই পেশার ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ কর্মীর জন্য আগের কাজের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে কাজ শুরু করতে চান এমন অনেক মানুষের জন্য এটি প্রবেশের তুলনামূলক সহজ একটি ক্ষেত্র।
তবে সাধারণ কর্মীদের বেতন এবং ব্যবস্থাপকদের বেতনের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ফাস্টফুড ও কাউন্টার কর্মীদের গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি ছিল প্রায় ১৫ ডলার ৪৬ সেন্ট। গড় বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৩২ হাজার ১৫০ ডলার। ফলে ২ লাখ ডলারের আয়কে সাধারণ কর্মীর বেতন হিসেবে দেখা যাবে না।
ফাস্টফুড খাত ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছাড়াই বিভিন্ন পেশায় ভালো আয়ের সুযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি কাজ, নির্মাণ, বৈদ্যুতিক কাজ, যানবাহন মেরামত, ট্রাক চালনা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণভিত্তিক পেশায় দক্ষ কর্মীদের চাহিদা রয়েছে।
কিছু পেশায় আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরের ডিগ্রির পরিবর্তে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ, সনদ বা কারিগরি শিক্ষা প্রয়োজন হয়। যেমন দন্ত পরিচর্যা সহকারী, পারমাণবিক প্রযুক্তিবিদসহ কিছু পেশায় বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে তুলনামূলক ভালো আয় করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারের সামগ্রিক চিত্র থেকে বোঝা যায়, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদই সাফল্যের একমাত্র পথ নয়। নির্দিষ্ট কাজের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও কর্মজীবনে বড় ভূমিকা রাখে।
ফাস্টফুড খাতের উদাহরণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ একজন কর্মী তুলনামূলক সহজ একটি প্রবেশ পর্যায়ের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে ধীরে ধীরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যেতে পারেন। তবে এই পথ দ্রুত ধনী হওয়ার কোনো সহজ উপায় নয়। উচ্চ আয় অর্জনের জন্য কয়েক বছর ধরে দক্ষতা বাড়ানো, অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়া এবং ধারাবাহিকভাবে ভালো কাজ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, যারা যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে কর্মজীবন শুরু করতে চান তারা শুরু থেকেই শুধু বেতনের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যৎ পদোন্নতির সুযোগও বিবেচনা করবেন। কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, কোথায় পদোন্নতির সুযোগ বেশি এবং কোন দক্ষতা অর্জন করলে উচ্চ পদে যাওয়া সম্ভব, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
অর্থাৎ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে কর্মজীবনের সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। সঠিক প্রশিক্ষণ, বাস্তব অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের গুণ এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে একজন সাধারণ কর্মীও সময়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাপনার পদে যেতে পারেন। আর কিছু প্রতিষ্ঠানে সেই পর্যায়ে পৌঁছালে বছরে এক লাখ থেকে দুই লাখ ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে।