Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

শনির চাঁদে প্রাণের সম্ভাবনা, নতুন গবেষণায় মিলল আশাব্যঞ্জক তথ্য

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:১৮ এএম

শনির চাঁদে প্রাণের সম্ভাবনা, নতুন গবেষণায় মিলল আশাব্যঞ্জক তথ্য

বিজ্ঞাপন

শনি গ্রহের বরফে ঢাকা উপগ্রহ এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন গবেষণায় আশাব্যঞ্জক তথ্য পাওয়া গেছে। পরীক্ষাগারে এনসেলাডাসের সম্ভাব্য সমুদ্রের মতো পরিবেশ তৈরি করে গবেষকেরা দেখেছেন, পৃথিবীর একটি বিশেষ ধরনের অণুজীব অত্যন্ত কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে এবং মিথেন তৈরি করতে পারে। তবে এনসেলাডাসে সত্যিই প্রাণ রয়েছে, এমন কোনো সরাসরি প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে’ প্রকাশিত গবেষণায় এনসেলাডাসের সমুদ্রের সম্ভাব্য রাসায়নিক পরিবেশ এবং সেখানে অণুজীবের টিকে থাকার বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা পরীক্ষাগারে উপগ্রহটির সমুদ্রের সম্ভাব্য পরিবেশ তৈরি করে পৃথিবীর একটি অণুজীব সেখানে কেমন আচরণ করে, তা পর্যবেক্ষণ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও অণুজীবটি বৃদ্ধি পেতে এবং মিথেন উৎপাদন করতে সক্ষম।

গবেষণায় ‘মিথানোথার্মোকক্কাস ওকিনাওয়েনসিস’ নামের একটি অণুজীব ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর গভীর সমুদ্রের উষ্ণ জলীয় উৎসের কাছাকাছি এ ধরনের অণুজীব পাওয়া যায়। এটি হাইড্রোজেন ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে মিথেন তৈরি করতে পারে। এনসেলাডাসের সম্ভাব্য সমুদ্রের পরিবেশে একই ধরনের প্রক্রিয়া সম্ভব কি না, সেটিই পরীক্ষার অন্যতম বিষয় ছিল।

গবেষকেরা পরীক্ষাগারে অত্যন্ত ক্ষারীয় পরিবেশ তৈরি করেন এবং সেখানে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি রাখেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, অণুজীবটি এমন কঠিন পরিবেশেও বৃদ্ধি পেতে এবং মিথেন উৎপাদন করতে পারে। পরীক্ষিত পরিবেশে এটি প্রায় ১১ পিএইচ মাত্রা পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। এই ফল এনসেলাডাসের সম্ভাব্য পরিবেশে পৃথিবীর কিছু অণুজীবের মতো জীব টিকে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এনসেলাডাসের পাথুরে অভ্যন্তর এবং পানির মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন তৈরি হতে পারে। এই হাইড্রোজেন যদি উপগ্রহটির সমুদ্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপস্থিত থাকে, তাহলে পৃথিবীর কিছু অণুজীবের মতো জীবের জন্য সেটি শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। নতুন গবেষণায় পরীক্ষাগারে পাওয়া ফল সেই সম্ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এনসেলাডাসকে ঘিরে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ এর বরফের নিচে তরল পানির সমুদ্র থাকার শক্তিশালী প্রমাণ। উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুর বরফের ফাটল দিয়ে পানীয় বাষ্প ও বরফের ক্ষুদ্র কণা মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে আসে। নাসার ক্যাসিনি মহাকাশযান এসব কণার মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়ে সেগুলোর রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণ করেছিল।

ক্যাসিনির সংগৃহীত তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা পানি, লবণ, জৈব যৌগ এবং অন্যান্য রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন। এসব তথ্যের কারণে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এনসেলাডাসের বরফের নিচে শুধু তরল পানিই নয়, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু রাসায়নিক উপাদানও থাকতে পারে। তবে এসব উপাদানের উপস্থিতি সেখানে প্রাণ থাকার সরাসরি প্রমাণ নয়।

২০২৩ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় এনসেলাডাস থেকে বেরিয়ে আসা বরফকণায় ফসফেট শনাক্ত করা হয়। ফসফরাস জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ওই গবেষণার ফল ইঙ্গিত দেয়, এনসেলাডাসের সমুদ্রে প্রাণের রাসায়নিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ফসফরাসের উপস্থিতি থাকতে পারে। এই তথ্যও উপগ্রহটির সমুদ্রকে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

২০২৫ সালে নাসার গবেষকেরা ক্যাসিনির সংগ্রহ করা তথ্য নতুনভাবে বিশ্লেষণ করে এনসেলাডাসের সমুদ্র থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসা বরফকণায় আগে শনাক্ত না হওয়া বেশ কিছু জৈব যৌগের সন্ধান পান। এসব জৈব যৌগকে প্রাণের প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। তবে এগুলোর উপস্থিতি এনসেলাডাসের ভেতরে জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া চলার সম্ভাবনা তুলে ধরে।

২০২৬ সালের নতুন গবেষণাগুলোতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। এনসেলাডাসের সমুদ্র থেকে বেরিয়ে আসা পানির কণা বরফে পরিণত হওয়ার সময় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে। এর ফলে কিছু বরফকণায় জৈব পদার্থ বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান তুলনামূলক বেশি ঘন হয়ে থাকতে পারে।

এই বিষয়টি ভবিষ্যতের মহাকাশ অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এনসেলাডাসের বরফের নিচে থাকা সমুদ্রে সরাসরি পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু দক্ষিণ মেরুর ফাটল দিয়ে যে বরফকণা ও বাষ্প মহাকাশে বেরিয়ে আসে, সেগুলো সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেই ভেতরের সমুদ্রের রাসায়নিক পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া কোনো তথ্যকেই এনসেলাডাসে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। পরীক্ষাগারে পৃথিবীর একটি অণুজীব এনসেলাডাসের মতো পরিবেশে টিকে থাকতে পারা শুধু এটিই দেখায় যে ওই ধরনের পরিবেশে জীবনের কিছু ধরন টিকে থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে। বাস্তবে এনসেলাডাসের সমুদ্রে এমন কোনো জীব রয়েছে কি না, সেটি এখনো অজানা।

বিজ্ঞানীদের পরবর্তী লক্ষ্য এনসেলাডাস থেকে বেরিয়ে আসা বরফ ও বাষ্পের মধ্যে এমন রাসায়নিক বা জৈব চিহ্ন খুঁজে বের করা, যা সরাসরি জীবনের অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। ভবিষ্যতের কোনো মহাকাশ অভিযানে সেখানে জীবকোষ, নির্দিষ্ট জৈব অণু কিংবা শক্তিশালী জীবচিহ্ন শনাক্ত করা সম্ভব হলে পৃথিবীর বাইরে জীবনের সন্ধানে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হবে।

এখন পর্যন্ত এনসেলাডাসে কোনো প্রাণ পাওয়া যায়নি। তবে বরফের নিচে তরল পানির সমুদ্র, রাসায়নিক শক্তির সম্ভাব্য উৎস, ফসফরাস, জৈব যৌগ এবং পরীক্ষাগারে পৃথিবীর অণুজীবের এমন পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা শনির এই বরফময় উপগ্রহকে প্রাণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। নতুন গবেষণার ফল সেই অনুসন্ধানে আরও একটি তথ্য যোগ করেছে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার