বিজ্ঞাপন
কানাডায় প্রতি দশজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হচ্ছে স্বেচ্ছামৃত্যুর মাধ্যমে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ পিএম
বিজ্ঞাপন
কানাডায় চিকিৎসকের সহায়তায় জীবনাবসানের ব্যবস্থা চালুর এক দশক পূর্ণ হওয়ার সময়ে এ ব্যবস্থার আওতায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চালু হওয়া ‘মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ডায়িং’ বা এমএআইডির আওতায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৭৬ হাজার ৪৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালেই এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মারা গেছেন ১৬ হাজার ৪৯৯ জন।
কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলে এমএআইডির আওতায় মৃত্যুর হার আরও বেশি। বিশেষ করে কুইবেক প্রদেশের লানদিয়ের অঞ্চলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট মৃত্যুর ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ এমএআইডির আওতায় হয়েছে বলে কুইবেকের জীবনাবসান-সংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। একই সময়ে পুরো কুইবেকে ৬ হাজার ২৬৮ জন এমএআইডির মাধ্যমে মারা যান, যা আগের সময়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।
তবে কানাডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করেছে। এমএআইডিকে দেশটির সরকারি পরিসংখ্যানে মৃত্যুর একটি ‘কারণ’ হিসেবে গণ্য করা হয় না। যেমন, কোনো ক্যানসার আক্রান্ত ব্যক্তি এমএআইডি গ্রহণ করে মারা গেলে মৃত্যুসনদে সাধারণত ক্যানসারকেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাই এমএআইডির সংখ্যা সরাসরি অন্যান্য রোগ বা মৃত্যুর কারণের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়।
২০২৪ সালের সরকারি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই বছর এমএআইডির আওতায় মৃত্যুর ৯৫ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল ‘ট্র্যাক-১’ শ্রেণির। অর্থাৎ এসব ব্যক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু যুক্তিসংগতভাবে অদূর ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত ছিল। বাকি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল ‘ট্র্যাক-২’, যেখানে স্বাভাবিক মৃত্যু অদূর ভবিষ্যতে প্রত্যাশিত ছিল না।
২০১৯ সালে কানাডায় এমএআইডির আওতায় ৫ হাজার ৪৬১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৭ হাজার ৪৬৯, ২০২১ সালে ১০ হাজার ৬৬, ২০২২ সালে ১৩ হাজার ১৯৯ এবং ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৪২৭ জনে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে সংখ্যা বেড়ে হয় ১৬ হাজার ৪৯৯। যদিও সংখ্যা বাড়ছে, বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালে বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০২৪ সালে এমএআইডির জন্য মোট ২২ হাজার ৫৩৫টি অনুরোধের তথ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা পড়ে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৪৯৯ জন শেষ পর্যন্ত এমএআইডি পান। আরও ৪ হাজার ১৭ জন আবেদনকারী অন্য কোনো কারণে মারা যান, ১ হাজার ৩২৭ জনকে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি এবং ৬৯২ জন নিজেদের আবেদন প্রত্যাহার করেন।
কানাডায় এমএআইডি চালুর পেছনে ২০১৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় ছিল। এরপর ২০১৬ সালে পার্লামেন্ট আইন প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট শর্ত ও সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে যোগ্য প্রাপ্তবয়স্কদের চিকিৎসকের সহায়তায় জীবনাবসানের সুযোগ দেয়। বর্তমানে মানসিক অসুস্থতাকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে এমএআইডির যোগ্যতার ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি ১৭ মার্চ ২০২৭ পর্যন্ত স্থগিত রয়েছে।
এদিকে কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ফ্রেজার ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের চিকিৎসা-অপেক্ষা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক চিকিৎসকের কাছ থেকে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর পর চিকিৎসা পাওয়া পর্যন্ত কানাডায় মধ্যমা অপেক্ষার সময় ছিল ২৮ দশমিক ৬ সপ্তাহ। অস্থি-সংক্রান্ত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে তা ছিল ৪৮ দশমিক ৬ সপ্তাহ। তবে এটি একটি স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকদের ওপর পরিচালিত জরিপভিত্তিক হিসাব, সরকারি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান নয়।
এমএআইডি নিয়ে বিতর্কের একটি বড় অংশ হলো, এটি রোগীর নিজের সিদ্ধান্ত ও কষ্ট থেকে মুক্তির অধিকারকে গুরুত্ব দেয়, নাকি গুরুতর অসুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন করে তুলতে পারে। কানাডার সরকার বলছে, এমএআইডির জন্য কঠোর যোগ্যতার শর্ত ও সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে কিছু চিকিৎসক, অধিকারকর্মী ও সংগঠন এসব সুরক্ষা কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যক্তিগত ঘটনাও এ বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। ৮৩ বছর বয়সী ব্রিজিট স্টেগেমানের মৃত্যুকে ঘিরে তার নাতনি অভিযোগ করেছেন, এমএআইডি গ্রহণের আগে তার দাদি সিদ্ধান্তটি নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন এবং শেষ মুহূর্তে বলেছিলেন, ‘আমি ভুল করেছি’। পরিবারটি ঘটনাটি তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও এমএআইডির সব নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা স্বাধীন তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়।
আরেকটি আলোচিত ঘটনা ২৬ বছর বয়সী কিয়ানো ভাফাইয়ানের। তিনি ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর এমএআইডির মাধ্যমে মারা যান। তার মা দাবি করেছেন, ছেলের শারীরিক সমস্যা ও মানসিক অবস্থার কারণে তিনি ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত অবস্থায় ছিলেন না। তবে এমএআইডি প্রদানকারী চিকিৎসক এলেন ভিয়েবে বলেছেন, তিনি কাউকে কেবল মানসিক অসুস্থতার ভিত্তিতে এমএআইডি দেননি। কানাডায় শুধু মানসিক অসুস্থতাকে ভিত্তি করে এমএআইডি দেওয়ার সুযোগ এখনও স্থগিত রয়েছে।
অন্যদিকে এমএআইডির সমর্থকেরা বলেন, গুরুতর ও অসহনীয় কষ্টে থাকা যোগ্য রোগীদের নিজেদের জীবনের শেষ পর্যায় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। কানাডার সরকারি প্রতিবেদনও এমএআইডিকে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও আইনি সুরক্ষার অধীনে দেওয়া একটি স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
কানাডায় এমএআইডি চালুর ১০ বছর পূর্তির সময়ে তাই এ ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক কেবল মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধিকে ঘিরে নয়। রোগীর স্বায়ত্তশাসন, চিকিৎসকের ভূমিকা, প্যালিয়েটিভ বা জীবনাবসানকালীন সেবা, চিকিৎসা পাওয়ার অপেক্ষার সময় এবং ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষা, সবকিছুই এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।
সূত্র: কানাডার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, কুইবেক কমিশন অন এনড-অব-লাইফ কেয়ার, ফ্রেজার ইনস্টিটিউট, নিউইয়র্ক পোস্ট