বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যে মসজিদে হা মলা-বিদ্বেষের জবাব সম্প্রীতিতে, শতাধিক মসজিদে আমন্ত্রণ সব ধর্মের মানুষকে
যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০০ এএম
বিজ্ঞাপন
উত্তর লন্ডনের একটি মসজিদে গাজার শিশুদের মতো সেখানকার শিশুদেরও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে একবার চিৎকার করেছিলেন এক নারী। অন্য একটি ঘটনায়, মসজিদ ভবনের গ্যাসের পাইপ কেটে এমনভাবে রাখা হয়েছিল যাতে ভেতরে গ্যাস জমে বড় ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
গত তিন বছরে লন্ডন ইসলামিক কালচারাল সোসাইটিকে এমন অসংখ্য বিদ্বেষমূলক ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে না নিয়ে বরং সাধারণ মানুষের জন্য নিজেদের দরজা আরও প্রসারিত করেছে মসজিদটি। শুধু এই একটি মসজিদই নয়, ইসলাম ও ব্রিটিশ মুসলমানদের সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করতে চলতি সপ্তাহে লন্ডন, বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, শেফিল্ড ও গ্লাসগোসহ যুক্তরাজ্যের শতাধিক মসজিদ সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
‘ভিজিট মাই মস্ক’ নামের এই বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে সাধারণ মানুষকে চা, ঐতিহ্যবাহী খাবার, আলোচনা চক্র, আন্তঃধর্মীয় কার্যক্রম এবং শিল্প প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের আয়োজনে ১১তম বছরে পদার্পণ করা এই কর্মসূচিটি বর্তমানে দেশটিতে ক্রমবর্ধমান ইসলামভীতির প্রেক্ষাপটে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংস্থাটির মহাসচিব ড. ওয়াজিদ আখতার জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে বহু মানুষ ব্রিটিশ মুসলিমদের সম্পর্কে নানা তথ্য অ্যালগরিদমের ওপর নির্ভর করে পাচ্ছে। এছাড়া বিদেশি অর্থায়নে পুষ্ট কিছু ধনকুবের বিষাক্ত প্রচারণার মাধ্যমে অনলাইন ও রাজপথে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণাকে উসকে দিচ্ছে।
ইস্ট লন্ডন মসজিদের মরিয়ম সেন্টারের প্রধান সুফিয়া আলম মনে করেন, ঘৃণার চেয়ে বন্ধুত্ব ও সংহতি যে অনেক বেশি শক্তিশালী, তা প্রমাণ করতেই তাদের এই অংশগ্রহণ। মানুষ যখন মসজিদে এসে মুসলিম পরিবার ও স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে কথা বলবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই অনেক স্টেরিওটাইপ ও ভয় দূর হয়ে যাবে।
যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা নিয়ে যখন গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই এই সম্প্রীতির উদ্যোগটি সামনে এলো। সরকারের অংশীদার হিসেবে কাজ করা ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের তথ্যমতে, দেশটিতে প্রতি পাঁচ দিনে অন্তত একটি মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে।
এর মধ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা, সম্পত্তি ধ্বংস, হয়রানি এবং অনলাইনে গালাগালির মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। ফিঞ্চবেরি পার্ক মসজিদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কোজবার বলেন, ক্রমবর্ধমান মুসলিমবিদ্বেষের সবচেয়ে ভালো জবাব হলো উন্মুক্ততা, সংলাপ এবং পারস্পরিক সংহতি বজায় রাখা।
উত্তর লন্ডনের মসজিদটি পরিচালনা করছেন বিবি খান, যিনি যুক্তরাজ্যের কোনো মসজিদের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট। শনিবার বিকেলে সব ধর্মের মানুষের জন্য মসজিদটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে সেখানে এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতির দৃশ্য দেখা যায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুসওয়েল হিল ইউনাইটেড সিনাগগের ডেপুটি এবং ব্রিটিশ ইহুদিদের একটি নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বিষয়ক বিভাগের ভাইস-চেয়ার জুডিথ প্রিন্সলি।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্যে মুসলিম ও ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও, বিবি খান ও প্রিন্সলির মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির এক দারুণ উদাহরণ তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া খবর ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবি খান জানান, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে, বিশেষ করে ইহুদিদের সাথে পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। মতানৈক্য থাকলেও কঠিন সময়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।