বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যে অভিবাসীবিরোধী বিদ্বেষের নতুন ঢেউ, প্রকাশ্যে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন ভিনদেশিরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৫৮ এএম
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে বসবাসরত একজন কেয়ার ওয়ার্কার অ্যাগনেস পিটার্স। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে তার গায়ের রঙের কারণে চরম বর্ণবাদী আচরণের শিকার হতে হয়। রাস্তায় নিজের পেশাগত ইউনিফর্ম পরা অবস্থাতেই তাকে উদ্দেশ্য করে বর্ণবাদী গালিগালাজ করা হয় এবং একটি ধীরগতির গাড়ি থেকে তার গায়ে বিভিন্ন জিনিস ছুঁড়ে মেরে তাকে ‘নিজের দেশে ফিরে যেতে’ বলা হয়।
আশেপাশের অনেকেই সেই দৃশ্য দেখছিলেন এবং ভিডিও করছিলেন, কিন্তু মাত্র একজন পথচারী ছাড়া কেউই এর প্রতিবাদ করেননি। গত বছর ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি যুক্তরাজ্যের বর্তমান সমাজে বর্ণবাদ ও অভিবাসীবিরোধী ঘৃণার এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে। ব্রেক্সিটের পর থেকে দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের পাশাপাশি অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও বৈষম্যের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অক্সফাম ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ ১৫২টি মানবাধিকার সংগঠন সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে স্বাভাবিক হয়ে ওঠা এই বর্ণবাদী সহিংসতার বিরুদ্ধে সরকারকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একসময় যেসব বর্ণবাদী সহিংসতা এবং ভীতি প্রদর্শনকে চরম পর্যায় বলে মনে করা হতো, তা এখন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সাপ্তাহিক সাধারণ ঘটনাতে পরিণত হয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে বাড়তে থাকা বৈষম্য, জনসেবা খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রচারণাই ইসলামভীতি ও অভিবাসীবিরোধী এই ঘৃণাকে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত করেছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কট্টর ডানপন্থি কর্মীরা এই বিদ্বেষকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের ভাষায় ‘কট্টর বর্ণবাদী’ ড্যানিয়েল থমাস সম্প্রতি ইংলিশ চ্যানেলে উদ্ধারকর্মীদের উপস্থিতিতেই একটি ভাসমান রেসকিউ বোট কেটে ফুটো করে দেওয়ার ভিডিও ধারণ করেন।
তার নেতৃত্বাধীন সংগঠন ‘প্যাট্রিয়ট প্ল্যাটফর্ম’ ডোভার ও পোর্টসমাউথ বন্দরে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের নামে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। অক্সফোর্ডশায়ারের পিডিংটন গ্রামেও এই কট্টরপন্থিরা সরকার-নির্ধারিত আশ্রয়প্রার্থীদের বাসস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার হুমকি দিচ্ছে।
‘স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম’-এর ম্যানচেস্টার সংগঠক নাহেলা আশরাফ অভিযোগ করে বলেন, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে অভিবাসীবিরোধী বিক্ষোভের নামে মুখোশধারী ব্যক্তিরা কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হামলা চালাচ্ছে।
দুঃখজনকভাবে, এই বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলো এখন রাজনীতির মাঠেও বৈধতা পাচ্ছে। রিফর্ম ইউকে দলের কট্টর ডানপন্থি এমপি সারাহ পোচিন এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, অভিবাসী ও শরণার্থীরা আদিবাসী শ্বেতাঙ্গ নারীদের জন্য হুমকিস্বরূপ।
দলটির স্বঘোষিত ‘শ্যাডো হোম সেক্রেটারি’ জিয়া ইউসুফ সোমালিয়ায় জন্মগ্রহণকারী লেবার পার্টির এক প্রার্থীর বিরুদ্ধে মন্তব্য করে বর্ণবাদের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন, যাকে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস 'সরাসরি বর্ণবাদ' বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর আগে কনজারভেটিভ দলের সাবেক নেতা রবার্ট জেনরিক এবং নিক টিমোথিও বিভিন্ন সময়ে মুসলিম এবং অ-শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন।
ইউনিভার্সিটি অব নর্দাম্পটনের অধ্যাপক পল জ্যাকসন এবং বাথ ইউনিভার্সিটির গবেষক অরেলিয়েন মনডন মনে করেন, মূলধারার রাজনীতি ও গণমাধ্যম যখন ডানপন্থি কট্টর চিন্তাধারাকে প্রশ্রয় দেয়, তখন চরমপন্থিরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
তবে এত নেতিবাচকতার মাঝেও আশার আলো দেখছেন সমাজকর্মীরা। ম্যানচেস্টারের সংগঠক নাহেলা আশরাফ জানান, কট্টর ডানপন্থিদের অর্থায়ন ও প্রচারণার জোর থাকলেও সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এখনও অভিবাসী ও শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিশুদের নিজ উদ্যোগে শরণার্থীদের জন্য বই উপহার দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সমাজে এখনও ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বার্তা টিকে আছে এবং ঘৃণা ছড়িয়ে বর্ণবাদীরা শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারবে না।