বিজ্ঞাপন
চাকরি ছেড়ে ঘুরে বেড়ান বিশ্ব, ভ্রমণ করেই এখন লাখ টাকা আয় ২৬ বছরের তরুণীর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম
বিজ্ঞাপন
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেন রিহ্যানন উড। সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার শুরু করার আগে কিছুদিন বিশ্ব ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল তাঁর। সেই ইচ্ছা থেকেই বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের ছোটখাটো কাজ শুরু করেন তিনি। তবে ধীরে ধীরে ভ্রমণ আর সেটিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাজে লাগিয়েই নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
এখন ভ্রমণই তাঁর পূর্ণকালীন কাজ। গ্রিস, পেরু ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন দেশে গ্রুপ ট্যুর পরিচালনা করেন তিনি। পাশাপাশি ইনস্টাগ্রামে নিজের ভ্রমণের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে তৈরি করেছেন প্রায় ৬০ হাজার অনুসারীর একটি কমিউনিটি। এই সংখ্যার কারণে তাঁকে ‘মাইক্রো ইনফ্লুয়েন্সার’ বলা হয়—সাধারণত ১০ হাজার থেকে ১ লাখ অনুসারী থাকা অনলাইন নির্মাতাদের এই শ্রেণিতে রাখা হয়।
রিহ্যাননের ভ্রমণের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরে। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে পড়াশোনার অংশ হিসেবে ফ্রান্সের লিয়নে থাকার সময় বন্ধুদের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে শুরু করেন তিনি। আল্পসে স্কিইং করার অভিজ্ঞতা তাঁকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে পড়াশোনা শেষ করেই কানাডার লেক লুইজে চলে যান।
কানাডায় স্কিইংয়ের পাশাপাশি নৌকা ও ক্যানো ভাড়া দেওয়া প্রতিষ্ঠান, জিপলাইন কোম্পানি এবং স্কি রিসোর্টে কাজ করেন রিহ্যানন। এসব কাজে ন্যূনতম মজুরি পেলেও নতুন জায়গায় থাকার আনন্দ ছিল তাঁর কাছে বড় বিষয়। কিন্তু একসময় কম বেতনের চাকরিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন তিনি। তখনই ভ্রমণের ছবি ও ভিডিও থেকে অনলাইনে আয় করার চিন্তা মাথায় আসে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ইনস্টাগ্রামে ভ্রমণ নিয়ে নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে পোস্ট করা শুরু করেন রিহ্যানন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশল শেখার জন্য বিভিন্ন ওয়েবিনারে অংশ নেন এবং একজন ইনস্টাগ্রাম কোচও নিয়োগ করেন। প্ল্যাটফর্মটির অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে এবং কী ধরনের কনটেন্ট দর্শকদের কাছে বেশি পৌঁছায়, সেসব বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
নিয়মিত পোস্ট শুরু করার মাত্র চার মাসের মধ্যেই প্রথম ব্র্যান্ড চুক্তি পান রিহ্যানন। অনলাইন গ্রুপ-ট্রিপ প্রতিষ্ঠান ম্যাপো টাপো তাঁকে সুইজারল্যান্ডে একটি ভ্রমণ দলের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেয়। ওই সফর থেকে তিনি ৩৩০ পাউন্ড বা প্রায় ৪৪৬ ডলার আয় করেন। এর আগে সরাসরি কোনো ট্যুর পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকলেও পাহাড়ে হাঁটা, পর্বতারোহণ ও রক ক্লাইম্বিংয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সফলভাবে সফর পরিচালনা করেন।
প্রথম চুক্তির পর ধীরে ধীরে আরও বড় সুযোগ আসতে থাকে। স্কাইস্ক্যানার, সিরোকো, রোমলেসসহ বিভিন্ন ভ্রমণ ও ক্রীড়া-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ব্যক্তিগত ও গ্রুপ ভ্রমণের কারণে পেরু, স্কটল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরেছেন। একই সঙ্গে এখন নিজের একটি ট্রাভেল এজেন্সি চালুর প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
রিহ্যাননের আয়ের বড় দুটি উৎস হলো ব্র্যান্ড চুক্তি ও গ্রুপ ট্যুর। সফরভেদে তাঁর কমিশনের পরিমাণও বদলে যায়। কোনো কোনো ট্রিপে তিনি ৩ হাজার ডলার পর্যন্ত কমিশন পেয়েছেন। সাধারণত তাঁর পরিচালিত সফরগুলো অন্তত এক সপ্তাহের হয়। ইনস্টাগ্রামে স্পনসরড রিলসের জন্যও এখন তিনি কয়েকশ ডলার থেকে শুরু করে ১ হাজার ডলারের বেশি পারিশ্রমিক নেন।
গ্রুপ ট্যুর থেকে পাওয়া অর্থ সাধারণত সঞ্চয় করেন রিহ্যানন। আর ইনস্টাগ্রামের স্পনসরশিপ থেকে পাওয়া অর্থ ব্যবহার করেন নিজের পছন্দের খরচে। তিনি জানান, ট্যুরের কমিশন এমনভাবে নির্ধারণ করার চেষ্টা করেন, যাতে প্রতিটি সফর থেকে তাঁর জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় অর্থ উঠে আসে।
বর্তমানে তাঁর আয় বছরে পাঁচ অঙ্কের ডলারের ঘরে। তবে ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সুযোগও বাড়ছে। ভ্রমণের কারণে অনেক সময় থাকা ও যাতায়াতের খরচ কমে যায় বা বিনামূল্যে হয়। বাজেট আবাসনে থাকা এবং খুব কম নতুন জিনিস কেনার কারণে খরচও নিয়ন্ত্রণে রাখেন তিনি। প্রায় এক বছর ধরে ব্যাকপ্যাক নিয়েই জীবন কাটাচ্ছেন রিহ্যানন।
তবে নিজের ব্যবসা পরিচালনার কারণে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। প্রতিদিনই ইমেইলের উত্তর দেওয়া, কনটেন্ট পোস্ট করা, ব্র্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা এবং পরবর্তী ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে হয় তাঁকে। এমনকি ভ্রমণে থাকলেও কাজ থেমে থাকে না। ফলে নিয়মিত ছুটি নেওয়ার সুযোগ খুব কম।
শুরুর দিকে স্পনসরশিপ নিয়ে আলোচনা করাও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। কোন পারিশ্রমিক দাবি করবেন বা ব্র্যান্ডগুলো সত্যিই তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চায় কি না—এসব নিয়ে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই দ্বিধা কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। এখন নিজের কাজ ও ভবিষ্যৎ সুযোগ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী রিহ্যানন।
ভিসা ও পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তা বোঝা, একাই পুরো ব্যবসা সামলানো, নতুন দেশে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং অনুসারী ও এনগেজমেন্টের প্রত্যাশা সামলানো—সব মিলিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছেন তিনি। তবে এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে আরও দক্ষ করে তুলছে। ভ্রমণকে শুধু শখ হিসেবে না রেখে সেটিকে ব্যবসায় পরিণত করার পথেই এগিয়ে যাচ্ছেন ২৬ বছরের এই তরুণী।