বিজ্ঞাপন
সাগরের তলদেশে সোলার প্যানেল বসিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনা বিজ্ঞানীদের সাফল্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৮ পিএম
বিজ্ঞাপন
সাগরের পানির নিচে সূর্যের আলো কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তিতে বড় অগ্রগতি করেছেন চীনের বিজ্ঞানীরা। ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি বিশেষ সৌরকোষ দক্ষিণ চীন সাগরের পানির ১০ মিটার গভীরতায় সফলভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। পরীক্ষায় এই সৌর মডিউল দিয়ে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ করার পাশাপাশি এলইডি আলোও জ্বালানো সম্ভব হয়েছে।
গবেষণাটি ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জুল’-এ প্রকাশিত হয়। গবেষণায় ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় ও সাউথওয়েস্ট ইউনাইটেড গ্র্যাজুয়েট স্কুলের গবেষকেরা পানির নিচে সৌরশক্তি সংগ্রহের জন্য প্রশস্ত ব্যান্ডগ্যাপের লেড-হ্যালাইড পেরোভস্কাইট সৌরকোষ ব্যবহার করেন। গবেষকদের মতে, পানির নিচে বাস্তব পরিবেশে ১০ মিটার গভীরতায় এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রদর্শন করা আগের পরীক্ষাগুলোর তুলনায় বড় অগ্রগতি।
সমুদ্রের পানির নিচে সূর্যের আলো খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে পানির কারণে আলোর বর্ণালিও বদলে যায়। বিশেষ করে দীর্ঘ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো দ্রুত শোষিত হওয়ায় পানির গভীরে নীল ও সবুজ আলোর আধিক্য থাকে। এ কারণে প্রচলিত সিলিকন সৌরকোষ পানির নিচে একইভাবে কার্যকর থাকে না। গবেষকেরা এই সমস্যার সমাধানে এমন পেরোভস্কাইট সৌরকোষ তৈরি করেছেন, যা পানির নিচে পৌঁছানো সীমিত আলোর বর্ণালির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
গবেষণাপত্র অনুযায়ী, নতুন সৌরকোষের শক্তি রূপান্তর দক্ষতা ১০ মিটার গভীরতার আলো অনুকরণ করে পরীক্ষায় ৩৪ দশমিক ৭১ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। কৃত্রিমভাবে ১০ মিটার গভীরতার পানির নিচের আলোর পরিবেশ তৈরি করে ১ হাজার ১৬০ ঘণ্টা পরীক্ষা চালানোর পরও কোষটির কার্যক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য অবনতি দেখা যায়নি। আর ত্বরিত বার্ধক্য পরীক্ষার ভিত্তিতে গবেষকেরা ধারণা করছেন, একই ধরনের পরিবেশে কোষটি প্রায় ৫ দশমিক ৫ বছর পর্যন্ত তার প্রাথমিক সক্ষমতার অন্তত ৮০ শতাংশ ধরে রাখতে পারে।
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরীক্ষাটি শুধু গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ ছিল না। দক্ষিণ চীন সাগরের ওয়েইঝৌ দ্বীপপুঞ্জের কাছে পানির নিচে রোবটের সঙ্গে বড় আকারের সৌর মডিউল যুক্ত করে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চালানো হয়। ২, ৬ এবং ১০ মিটার গভীরতায় মডিউলগুলো পরীক্ষা করা হয়। ১০ মিটার গভীরতায় দুই ঘণ্টা সূর্যালোকের মধ্যে মডিউলটি ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ এবং এলইডি চালানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
এর আগে পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে যেসব পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ২ মিটার বা তার কম গভীরতায় সীমাবদ্ধ ছিল। গবেষণার অন্যতম লেখক ঝাং ওয়েন-হুয়া বলেন, এত অল্প গভীরতার পরীক্ষা বাস্তব সমুদ্রভিত্তিক প্রয়োগের জন্য যথেষ্ট নয়। নতুন পরীক্ষায় ১০ মিটার গভীরতায় বড় আকারের সৌর মডিউল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন দেখানো হয়েছে, যা পানির নিচে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পানির নিচে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারও বিস্তৃত। গবেষকদের মতে, সমুদ্রের তলদেশে থাকা বিভিন্ন সেন্সর, ক্যামেরা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যন্ত্রে নিয়মিত ব্যাটারি বদলানো বা বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার প্রয়োজন কমাতে এটি ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় মানুষের সরাসরি তত্ত্বাবধানের বাইরে থাকা সামুদ্রিক যন্ত্রের জন্য এমন একটি স্থানীয় বিদ্যুৎ উৎস গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে প্রযুক্তিটি এখনো গবেষণা ও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। ১০ মিটার গভীরতায় সফলতা পাওয়া গেলেও আরও বেশি গভীরতায় এর কার্যকারিতা কেমন থাকবে, দীর্ঘ সময় সমুদ্রের প্রকৃত পরিবেশে কীভাবে কাজ করবে এবং সামুদ্রিক জীব ও আবর্জনা জমে সৌরকোষের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেসব বিষয় নিয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। গবেষকেরা পরবর্তী ধাপে আরও গভীর পানিতে এই প্রযুক্তির সীমা পরীক্ষা এবং পানির নিচের সৌরকোষের জন্য মানসম্মত পরীক্ষাপদ্ধতি তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
অর্থাৎ, এটি এখনই প্রচলিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প নয়। তবে সমুদ্রের পানির নিচে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রকে দীর্ঘ সময় নিজস্বভাবে বিদ্যুৎ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি নতুন একটি সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, জুল, ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়