Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতারণা কেন্দ্রে বাংলাদেশিরা: জাতিসংঘ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতারণা কেন্দ্রে বাংলাদেশিরা: জাতিসংঘ

বিজ্ঞাপন

উচ্চ বেতন ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষিত বাংলাদেশিদের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে অনলাইন প্রতারণা চক্রে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন দালালচক্রের মাধ্যমে এসব বাংলাদেশিকে প্রথমে বিদেশে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের অনেককে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসনস ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০২২ সাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন প্রতারণা কার্যক্রমে জোরপূর্বক অপরাধে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে পাচারের শিকার বাংলাদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাসে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার বেতনের চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁদের আকৃষ্ট করা হয়। প্রতারণামূলক নিয়োগের পাশাপাশি লাইসেন্সধারী নিয়োগ সংস্থা ও স্থানীয় অনানুষ্ঠানিক দালালদের কয়েক স্তরের নেটওয়ার্কও এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলাদেশিদের জন্য যেসব দেশকে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ক্ষেত্রে প্রতারণামূলক অনলাইন নিয়োগই পাচারকারীদের প্রধান কৌশল। অনেক সময় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দালালদের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং বিদেশে ভালো চাকরির সুযোগের কথা বলে তাঁদের প্রলুব্ধ করা হয়।

এই পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সবাই যে কম শিক্ষিত বা অদক্ষ, তা নয়। বরং বাংলাদেশ নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতারণা কেন্দ্রে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ রয়েছেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪ জন উচ্চমাধ্যমিক, ৪৮ জন মাধ্যমিক, ২৫ জন স্নাতক এবং তিনজন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ছিলেন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিদেশে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৬ জন ঢাকার, ২৮ জন চট্টগ্রামের, ২৫ জন খুলনার এবং ২২ জন রাজশাহীর বাসিন্দা ছিলেন।

বিদেশে যাওয়ার সময় ৮৪ জন অবিবাহিত এবং ৬৬ জন বিবাহিত ছিলেন। পাচারের আগে ২২ জন শিক্ষার্থী এবং ১৬ জন বেকার ছিলেন। আয়ের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা ছিল অনেকের। ৫৭ জন জানিয়েছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁদের কোনো মাসিক আয় ছিল না। আর ৬০ জনের মাসিক আয় ছিল ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, প্রতারণা কেন্দ্রগুলো শিক্ষিত মানুষকে টার্গেট করে, কারণ এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ইংরেজি ভাষা ও কম্পিউটার ব্যবহারের দক্ষতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

শরিফুল হাসান আরও বলেন, বাংলাদেশে সাইবার প্রতারণা কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও দক্ষতা ক্রমেই সহজলভ্য হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমন কিছু কেন্দ্র ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে বলেও তাঁরা সন্দেহ করছেন।

ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শুধু অনলাইন প্রতারণায় যুক্ত করা হয় না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁদের দিয়ে অন্যান্য অপরাধও করানো হয়। তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো, ভয়ভীতি দেখানো এবং অন্য কর্মীদের ওপর সহিংসতা চালাতে বাধ্য করার ঘটনাও প্রতিবেদনে নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের একজন তরুণের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২২ সালে বিশের কোঠায় থাকা ওই বাংলাদেশি একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে চাকরির আশ্বাসে পরিচিত একজনের মাধ্যমে কম্বোডিয়ায় যান। বিদেশে যাওয়ার জন্য তাঁর পরিবার জমি বন্ধক রেখে ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত নিয়োগ ফি পরিশোধ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালালরা তাঁকে একটি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তাঁকে নমপেন থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দূরের দারা সাকোর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের লং বে নামের একটি প্রতারণা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।.

ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তাঁকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি এবং বিনিয়োগের নামে অনলাইন প্রতারণা করতে বাধ্য করা হয়। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হলে তাঁকে নির্যাতন করা হতো। এমনকি অন্য কর্মীদের মারধর করতেও ওই বাংলাদেশিকে বাধ্য করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় বড় প্রতারণা কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি ছোট পরিসরের জায়গা, যেমন ভাড়া করা বাড়ি, হোটেল ও অ্যাপার্টমেন্টেও এ ধরনের কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এসব কেন্দ্র শনাক্ত করা এবং পাচারের শিকার ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

এ ধরনের ঘটনায় একটি বড় সমস্যা হলো, প্রতারণা করতে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের অনেক সময় প্রথমে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউএনওডিসি বলছে, কেউ ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছে, অনলাইনে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বা প্রতারণার অন্য কোনো কাজে যুক্ত আছে বলেই তাকে স্বেচ্ছায় অপরাধে জড়িত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। তিনি পাচারের শিকার কি না, তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইউএনওডিসির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে আরও বলা হয়েছে, বিদেশ থেকে প্রতারণা কেন্দ্র থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশিদের নিয়মিতভাবে পাচারের শিকার কি না, তা যাচাই করা হয় না। ২০২৪ সালে জাতীয় রেফারেল ব্যবস্থা ও ভুক্তভোগী শনাক্তকরণ নির্দেশিকা চালু হলেও এর প্রয়োগ এখনো ধারাবাহিক নয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আর্থিক তদন্ত এবং অর্থপাচার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত লেনদেন অনুসন্ধানের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এর পেছনে থাকা মানবপাচার চক্র এবং জোরপূর্বক অপরাধে যুক্ত করা ব্যক্তিদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা প্রয়োজন। ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও দালালচক্রের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা, কাজের স্থান, বেতন ও ভিসার তথ্য যাচাই এবং সন্দেহজনক প্রস্তাব সম্পর্কে সতর্ক থাকার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সূত্র: ইউএনওডিসি, নিউ এজ, ব্র্যাক।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার