বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি মহাসড়কে উবার থেকে নামিয়ে দেওয়ার পর গাড়ির ধাক্কায় ২৩ বছর বয়সী এক তরুণী নিহত হওয়ার ঘটনায় তার বাবা-মাকে ৪০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ দিনের সালিশি শুনানি শেষে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক রিচার্ড এ. স্টোন উবার ও চালক ভু ট্রানকে ওই ঘটনায় যৌথভাবে দায়ী করেন। নিহত এমিলি নরম্যান্ডিন-পার্কারের বাবা ক্যারল নরম্যান্ডিন ও মা কেন পার্কারকে ২০ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট। এমিলি তার বন্ধু লুনা মুরের সঙ্গে রাতে বাইরে যাওয়ার পর উবারে করে বাড়ি ফিরছিলেন। যাত্রাপথে মুর অসুস্থ হয়ে পড়লে চালক ভু ট্রান অরেঞ্জ কাউন্টির স্টেট রুট ৭৩-এর একটি ‘গোর পয়েন্টে’ গাড়ি থামান। এটি মহাসড়কের মূল সড়ক ও অফ-র্যাম্পের মাঝের ত্রিভুজাকৃতির একটি অংশ।
সালিশি রায়ে বিচারক স্টোন ওই জায়গাটিকে ‘অনিরাপদ ও অবৈধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, ট্রান চাইলে কাছের ম্যাকআর্থার বুলেভার্ডের প্রস্থানপথ ব্যবহার করে নিরাপদ স্থানে গাড়ি থামাতে পারতেন। রায়ে আরও বলা হয়, ট্রান জানতেন দুই যাত্রীই মদ্যপ ছিলেন। গাড়ি পরিষ্কারের খরচ নিয়ে মুরের সঙ্গে তার বিরোধের পর তিনি তাদের ওই স্থানে নামিয়ে দেন।
এরপর এমিলি মহাসড়কের মূল সড়কে চলে যান এবং একটি গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। সালিশি রায়ে বলা হয়েছে, জিপিএস তথ্য অনুযায়ী ট্রান সেখান থেকে চলে যাওয়ার সময় এমিলির মরদেহের কাছ দিয়ে যান। এরপর পরবর্তী প্রস্থানপথ দিয়ে মহাসড়ক থেকে বের হয়ে তিনি উবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং গাড়ি পরিষ্কারের খরচ পাওয়ার বিষয়ে কথা বলেন।
বিচারক স্টোন ট্রানের সাক্ষ্য নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন। সালিশি রায়ে তার বক্তব্যকে প্রায় সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিচারকের মতে, ট্রান যাত্রীদের নিরাপত্তার চেয়ে নিজের নতুন গাড়ি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। একই সঙ্গে তার কাছে দুই নারীকে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ ছিল বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়।
এমিলির পরিবারের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে সালিশি শুনানিতে ট্রানের আগের আচরণ নিয়েও তথ্য উপস্থাপন করা হয়। তাদের দাবি, ট্রানের গাড়ি চালানো নিয়ে উবারের কাছে আগে থেকেই একাধিক অভিযোগ ছিল। একজন যাত্রী তার সঙ্গে হওয়া যাত্রাকে নিজের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে অনিরাপদ যাত্রা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আরেকজন অভিযোগ করেছিলেন, ট্রান গাড়ি চালাতে পারেন না।
এমিলির বাবা কেন পার্কার অভিযোগগুলোর মধ্যে একমুখী সড়কে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, অনিয়মিতভাবে গাড়ি চালানো এবং পথচারীদের প্রায় ধাক্কা দেওয়ার মতো আচরণের কথা উল্লেখ করেন। তবে উবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রান এখন আর তাদের প্ল্যাটফর্মে চালক হিসেবে কাজ করেন না।
পাঁচ দিনের সালিশি প্রক্রিয়া শেষে এমিলির বাবা ও মাকে ২০ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই ঘটনায় তার বন্ধু লুনা মুরকে ৩ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
সালিশি রায়ে উবারকে চালক ট্রানের অবহেলার জন্য আইনগতভাবে দায়ী করা হয়। উবারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি মূলত যাত্রী ও চালকদের সংযোগকারী একটি প্রযুক্তি কোম্পানি। তবে বিচারক সেই যুক্তি গ্রহণ করেননি। তার সিদ্ধান্তে বলা হয়, উবার অ্যাপের মাধ্যমে পরিবহনসেবা দেয়, ভাড়া নির্ধারণ করে এবং যাত্রীদের যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিক নিয়ন্ত্রণ করে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ‘প্রপোজিশন ২২’ নিয়েও উবারের যুক্তি ছিল। ২০২০ সালে অনুমোদিত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অ্যাপভিত্তিক চালকদের কর্মচারীর পরিবর্তে স্বাধীন ঠিকাদার হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়। তবে সালিশি বিচারক মনে করেন, এই বিধান ট্রানের আচরণের জন্য উবারকে দায়মুক্তি দেয় না।
উবার এক বিবৃতিতে এমিলির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, কোনো পরিবারেরই সন্তান হারানোর কষ্ট পাওয়া উচিত নয়। তবে উবার একই সঙ্গে জানিয়েছে, সালিশি প্রক্রিয়াকে সম্মান করলেও প্রতিষ্ঠানটিকে ওই ঘটনার জন্য আইনগতভাবে দায়ী করার সিদ্ধান্তকে তারা ভুল মনে করে। উবার আরও জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে যাত্রী নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন প্রযুক্তি, নীতিমালা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে এমিলির বাবা-মা মেয়ের মৃত্যুর পর তার স্মরণে ‘এমিলি নরম্যান্ডিন-পার্কার ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাইডশেয়ারিং সেবায় যাত্রীদের নিরাপত্তা জোরদার এবং করপোরেট জবাবদিহি নিয়ে কাজ করার লক্ষ্যেই ফাউন্ডেশনটি গঠন করা হয়েছে। সালিশি মামলায় পাওয়া অর্থের একটি অংশ এই উদ্যোগে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
এমিলি ২০২২ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। মেয়েকে স্মরণ করে তার মা জানিয়েছেন, এমিলির হাসি ছিল সংক্রামক। পরিবার জানিয়েছে, তিনি ছিলেন হাসিখুশি এবং গান গাইতে ভালোবাসতেন।
সূত্র: গুড মর্নিং আমেরিকা