Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

কুয়েতে প্রবাসীদের জন্য এলো বড় নতুন সিদ্ধান্ত

অতিরিক্ত ৭ হাজার শিক্ষক ছাঁটাই

Icon

জাগো বাংলা প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৭ এএম

কুয়েতে প্রবাসীদের জন্য এলো বড় নতুন সিদ্ধান্ত

বিজ্ঞাপন

কুয়েতে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকসংখ্যা ও প্রকৃত চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের জনবল পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ শুরু করেছে দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত মন্ত্রণালয়ের সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, বিভিন্ন শিক্ষাবিষয় ও শিক্ষাস্তরে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা বেশি থাকার বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে। এই উদ্বৃত্ত ধাপে ধাপে কমানোর পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৭ হাজার ১৯ জন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও শিক্ষিকার চাকরির চুক্তি শেষ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংশোধন করা দরকার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৩৩ হাজার ২৬৬ জনের কথা বলা হলেও কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি হিসাবে উদ্বৃত্ত শিক্ষকের সংখ্যা ৩৩ হাজার ২৬৮ জন। এই সংখ্যা শুধু প্রবাসী শিক্ষকদের নয়; এর মধ্যে কুয়েতি নাগরিক, উপসাগরীয় দেশের শিক্ষক, রাষ্ট্রহীন বাসিন্দা এবং আরব ও অন্যান্য জাতীয়তার চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষক রয়েছেন। মন্ত্রণালয় বলেছে, এসব শিক্ষক এমন কিছু বিষয়ে কর্মরত যেখানে বিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় কর্মীর সংখ্যা বেশি। 

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কুয়েতের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক পদে থাকা কর্মীদের বাদ দিয়ে মোট শিক্ষক ও শিক্ষিকার সংখ্যা প্রায় ৯১ হাজার ৭৬১। এর মধ্যে কুয়েতি নাগরিকদের অংশ প্রায় ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ। উপসাগরীয় দেশের নাগরিক ও রাষ্ট্রহীন বাসিন্দাদের অংশ প্রায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ। আর আরব ও অন্যান্য জাতীয়তার বাসিন্দা শিক্ষকদের অংশ প্রায় ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। 

এই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রথম পর্যায়ে আরব ও অন্যান্য জাতীয়তার চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের মধ্য থেকে প্রায় ৭ হাজার ১৯ জনকে চুক্তি সমাপ্তির আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ এই পর্যায়ের সিদ্ধান্তটি মূলত চুক্তিভিত্তিক বিদেশি শিক্ষকগোষ্ঠীর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তবে সরকারি বিবৃতিতে নির্দিষ্ট করে কোন কোন দেশের কতজন শিক্ষক এই তালিকায় রয়েছেন, সেই জাতীয়তাভিত্তিক পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তাই কোনো নির্দিষ্ট দেশের সব শিক্ষক চাকরি হারাবেন এমন দাবি করার সুযোগ নেই। 

চাকরি বা চুক্তি সমাপ্তির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের জানাতে কুয়েত সরকারের সরকারি সেবামূলক মোবাইল ব্যবস্থা ‘সাহেল’ ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে কিছু শিক্ষক ‘চুক্তি সমাপ্তির বিজ্ঞপ্তি’ পেয়েছেন। এসব বিজ্ঞপ্তিতে চুক্তির নির্দিষ্ট ধারার উল্লেখ এবং নির্ধারিত নোটিশ সময় মেনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। 

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কোনো একবারে সব উদ্বৃত্ত শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। বরং পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক দরকার, কোন বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক প্রয়োজন এবং ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও চাহিদা কেমন হতে পারে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করেই উদ্বৃত্ত নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। 

প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরবি ভাষা, ইংরেজি ভাষা, ইসলামি শিক্ষা, চারুকলা এবং সংগীত শিক্ষার মতো বিষয়ে উদ্বৃত্ত চিহ্নিত হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষা, সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়, চারুকলা, সংগীত, বিদ্যুৎ এবং সাজসজ্জা শিক্ষার ক্ষেত্রে উদ্বৃত্তের কথা জানানো হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে রসায়ন, দর্শন, ভূতত্ত্ব, ইসলামি শিক্ষা, চারুকলা, সংগীত এবং ভূগোলের মতো বিষয়েও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শিক্ষক থাকার কথা বলেছে মন্ত্রণালয়। 

অর্থাৎ সিদ্ধান্তটি কোনো একটি বিষয় বা একটি শিক্ষাস্তরের শিক্ষকদের কেন্দ্র করে নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষকসংখ্যা পর্যালোচনা করে যেখানে অতিরিক্ত জনবল পাওয়া গেছে, সেখানেই ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব বিষয়ে শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে এই উদ্বৃত্তকে সমন্বয় করার বিষয়টিও জনবল পরিকল্পনার অংশ বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

এই পরিকল্পনার আরেকটি বড় দিক হলো সরকারি ব্যয় কমানো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৭ হাজার ১৯ জন শিক্ষক ও শিক্ষিকার চুক্তি শেষ করার ফলে শুধু বেতন খাতেই বছরে আনুমানিক ৪২ মিলিয়ন কুয়েতি দিনার সাশ্রয় হতে পারে। বাংলাদেশি টাকায় এর পরিমাণ নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সময়ের মুদ্রাবিনিময় হারের ওপর। এই হিসাবকে মন্ত্রণালয় সম্ভাব্য বার্ষিক সাশ্রয় হিসেবে উল্লেখ করেছে, চূড়ান্ত সাশ্রয় হিসেবে নয়। 

মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষকসংখ্যা বিদ্যালয়ের প্রকৃত প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে জনবল ও অর্থ দুই ক্ষেত্রেই পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগের প্রবণতা কমানো এবং নতুন নিয়োগকে বিদ্যালয়ের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যও রয়েছে। কুয়েতের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্য কুয়েতি নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং যেসব বিষয়ে যোগ্য জাতীয় জনবল পাওয়া যায়, সেসব ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে স্থানীয়করণ বাড়ানোর বিষয়টিও পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। 

প্রবাসী শিক্ষকদের জন্য এই সিদ্ধান্তটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রথম ধাপের ৭ হাজার ১৯ জনই আরব ও অন্যান্য জাতীয়তার চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকগোষ্ঠী থেকে নেওয়া হচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কুয়েতে কর্মরত সব প্রবাসী শিক্ষক চাকরি হারাবেন। মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেইসব বিষয় ও পদে যেখানে বিদ্যালয়ের প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা বেশি। ফলে কোনো শিক্ষকের চাকরি এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বে কি না, তা তার জাতীয়তার পাশাপাশি বিষয়, পদ, চুক্তির ধরন এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় একই সময়ে নতুন শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের এবং ১৪ সেপ্টেম্বর অন্যান্য প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরু হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের পাঠদান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষকসংখ্যা পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি নতুন শিক্ষাবর্ষও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। 

এদিকে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কুয়েতে মাধ্যমিক পর্যায়ের নতুন শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে ১২টি বিদ্যালয়ে ২ হাজার ৯৯১ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান শুরু হয়েছে। দেশটির ছয়টি শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের ও মেয়েদের জন্য দুটি করে বিদ্যালয়ে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এতে বোঝা যায়, শিক্ষকসংখ্যা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি শুধু ব্যয় কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের ধরন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক চাহিদা এবং নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে জনবল পরিকল্পনাকে সামঞ্জস্য করার উদ্যোগও চলছে। 

কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, উদ্বৃত্ত কমানোর সময় বিদ্যালয়ে পাঠদান যেন ব্যাহত না হয় এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেটি বিবেচনায় রাখা হবে। অর্থাৎ যেসব বিষয়ে শিক্ষকসংখ্যা বাস্তব চাহিদার চেয়ে বেশি, সেখানেই ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীসংখ্যা ও বিদ্যালয়ের প্রয়োজন বিবেচনা করে জনবল পরিকল্পনা করার কথা জানানো হয়েছে। 

সব মিলিয়ে, কুয়েতে শিক্ষকসংখ্যা পুনর্বিন্যাসের এই উদ্যোগ প্রবাসী শিক্ষক মহলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারি হিসাবে বর্তমানে প্রায় ৩৩ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষক বিভিন্ন বিষয়ে উদ্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত হলেও প্রথম ধাপে প্রায় ৭ হাজার ১৯ জন চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক ও শিক্ষিকার চুক্তি সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সরকারি ‘সাহেল’ ব্যবস্থার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে। তবে পরবর্তী ধাপে কতজনের চুক্তি শেষ হবে, কোন কোন বিষয় নতুন করে তালিকায় যুক্ত হবে এবং কত সময়ের মধ্যে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে—এসব বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সময়সূচি প্রকাশ করেনি কুয়েতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাই প্রবাসী শিক্ষকদের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য হলো সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও ব্যক্তিগত সরকারি নোটিশ, বিশেষ করে ‘সাহেল’-এ আসা বার্তা। 

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার