Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

সামান্য দাঁতের ব্যথা থেকে ওপেন হার্ট সার্জারি! শরীরে ধরা পড়ল ‘নীরব ঘাতক’ রোগ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

সামান্য দাঁতের ব্যথা থেকে ওপেন হার্ট সার্জারি! শরীরে ধরা পড়ল ‘নীরব ঘাতক’ রোগ

বিজ্ঞাপন

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের ৩৫ বছর বয়সী লুক উডহাউসের কাছে দাঁতের ব্যথাটি শুরুতে তেমন গুরুতর কিছু মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেই ব্যথার সঙ্গে জ্বর, কাঁপুনি, প্রচণ্ড ঘাম, বুকে চাপ এবং মাথায় তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে জানা যায়, তার শরীরে সেপসিস হয়েছে এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে হৃদযন্ত্রের ভালভ পর্যন্ত। জীবন বাঁচাতে তাকে ওপেন হার্ট সার্জারি করে ক্ষতিগ্রস্ত ভালভের বদলে মেকানিক্যাল ভালভ বসাতে হয়।

কুইন্সল্যান্ডের মোরেটন বে এলাকার বাসিন্দা লুকের কোনো বড় ধরনের আগের স্বাস্থ্য সমস্যা ছিল না। একটি বৃহস্পতিবার কর্মস্থলে থাকা অবস্থায় তিনি দাঁতে ব্যথা অনুভব করেন। পরে বিকেলের দিকে অসুস্থ লাগার সঙ্গে জ্বরও আসে। বিষয়টিকে তিনি সাধারণ ভাইরাল অসুস্থতা ভেবে তেমন গুরুত্ব দেননি। কুইন্সল্যান্ড হেলথকে তিনি জানান, তার ধারণা ছিল ঘুমিয়ে নিলে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু ওই রাতেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। প্রচণ্ড কাঁপুনি শুরু হয় এবং এত বেশি ঘাম হয় যে সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি দেখেন বিছানা ভিজে গেছে। এরপর রবিবার তার মাথায় একটানা তীব্র জ্বালাপোড়া এবং বুকে চাপ অনুভূত হতে থাকে। তখন তিনি বুঝতে পারেন, বিষয়টি আর সাধারণ অসুস্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

লুকের স্ত্রী জেনিফার তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। রেডক্লিফ হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তার হৃদযন্ত্রের চারপাশে প্রদাহের লক্ষণ দেখতে পান। পরে তাকে জানানো হয়, তার রক্তে সংক্রমণ হয়েছে এবং তিনি সেপসিসে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর সংক্রমণজনিত জটিলতায় তার ইনফেকটিভ এন্ডোকার্ডাইটিস ধরা পড়ে। এটি হৃদযন্ত্রের ভেতরের আবরণ ও ভালভে হওয়া গুরুতর সংক্রমণ, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে জীবনহানির কারণ হতে পারে।

লুকের ক্ষেত্রে সংক্রমণ এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে তার হৃদযন্ত্রের একটি ভালভ নষ্ট হয়ে যায়। ব্রিসবেনের দ্য প্রিন্স চার্লস হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাকে জানান, দ্রুত অস্ত্রোপচার না করলে তার আর বেশি দিন বেঁচে থাকা সম্ভব নাও হতে পারে। সেই সপ্তাহেই তার ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। সংক্রমিত ভালভটি অপসারণ করে সেখানে একটি মেকানিক্যাল ভালভ বসানো হয়।

অস্ত্রোপচারের আগে লুকের স্ত্রী জেনিফারের জন্য সময়টি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগের। চিকিৎসকেরা তার মস্তিষ্ক, কিডনি ও হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন পরীক্ষা করেন। জেনিফার পরিচিত কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গেও যোগাযোগ করে জানতে চেয়েছিলেন, তার স্বামী শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না।

কুইন্সল্যান্ড হেলথ জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছর ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ সেপসিসে আক্রান্ত হন এবং ৮ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এ কারণে। কুইন্সল্যান্ডের সরকারি হাসপাতালগুলোতেই বছরে ১৮ হাজারের বেশি রোগী সেপসিসের চিকিৎসা নেন। সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিক্রিয়া যখন নিজের সুস্থ টিস্যু ও অঙ্গের ক্ষতি করতে শুরু করে, তখন সেপসিস দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি কিডনি বিকল হওয়া, লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন, অঙ্গহানি এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

লুকের অস্ত্রোপচার সফল হয়। তবে এক বছর পরও তাকে নতুন কিছু দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হচ্ছে। মেকানিক্যাল হার্ট ভালভ নিয়ে তাকে ভবিষ্যতেও নিয়মিত যত্ন ও চিকিৎসা অনুসরণ করতে হবে। তিনি জানান, এই অভিজ্ঞতার পর সাধারণ জীবনের ছোট ছোট বিষয়, যেমন গিটার বাজানো বা ছবি আঁকার মতো কাজও তার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে অন্যদের সতর্ক করতে চান লুক। তার মতে, গুরুতর অসুস্থতা সব সময় শুরুতেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। জ্বর, কাঁপুনি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাসকষ্ট, দ্রুত হৃদস্পন্দন, প্রস্রাব কমে যাওয়া, বমি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বিভ্রান্তি কিংবা অস্বাভাবিক ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

কুইন্সল্যান্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, সেপসিসের একটি নির্দিষ্ট উপসর্গ নেই। তাই সংক্রমণের সঙ্গে শরীরের অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। লুকের নিজের অভিজ্ঞতার পরামর্শও একই, শরীরের অস্বাভাবিক সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে সেপসিসের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে হবে।

দাঁতের ব্যথা থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনা লুকের জন্য শুধু একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিই তৈরি করেনি, বরং একটি সাধারণ উপসর্গও কখনো কখনো গুরুতর সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, সেই সতর্কতাও সামনে এনেছে। এক বছর পর সুস্থ হয়ে উঠলেও হৃদযন্ত্রে মেকানিক্যাল ভালভ নিয়ে তাকে বাকি জীবন সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার