Logo
Logo
×

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক

৪ বছর বয়সে চিকিৎসকরা বলেছিলেন সে কখনো স্বাবলম্বী হবে না, আজ তিনি হতে যাচ্ছেন ডাক্তার

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৪ পিএম

৪ বছর বয়সে চিকিৎসকরা বলেছিলেন সে কখনো স্বাবলম্বী হবে না, আজ তিনি হতে যাচ্ছেন ডাক্তার

বিজ্ঞাপন

চার বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে পারেননি ফক্স রাইকার। ওই বয়সে তার অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসকেরা পরিবারকে জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে তিনি স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। কিন্তু সেই আশঙ্কাকে ভবিষ্যতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নেয়নি তার পরিবার।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার বাসিন্দা ফক্সের শৈশব কেটেছে যোগাযোগ ও সামাজিক দক্ষতা শেখার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। তিনি চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়েছেন এবং প্রায় এক দশক বিভিন্ন ধরনের থেরাপি নিয়েছেন। তার নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলায় কথোপকথন শুরু করা, অন্যের মুখের অভিব্যক্তি বোঝা এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, এসব বিষয় আলাদাভাবে অনুশীলন করতে হয়েছে।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফক্স শুধু যোগাযোগের দক্ষতাই অর্জন করেননি, একাডেমিক ক্ষেত্রেও নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দেন। সেন্ট জোসেফস ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সম্মানসহ পড়াশোনা শেষ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম সহায়তা কর্মসূচির প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

স্নাতক শেষ করার পর ফক্স পেনসিলভানিয়ার পাওলি হাসপাতালে জরুরি বিভাগের প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করেন। সেখানে গুরুতর অসুস্থ বা জরুরি অবস্থায় আসা রোগীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার চিকিৎসক হওয়ার আগ্রহকে আরও দৃঢ় করে।

২০২৩ সালে সিবিএস ফিলাডেলফিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফক্স জানিয়েছিলেন, চিকিৎসকেরা একসময় মনে করেছিলেন তিনি হয়তো স্বাবলম্বীভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন না। কিন্তু হাসপাতালের সহকর্মীরা পরে তার কাজের প্রশংসা করেন। পাওলি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক স্টুয়ার্ট ব্রিল্যান্ট জানিয়েছিলেন, ফক্সকে দেখে কর্মক্ষেত্রে তার অটিজম বোঝার উপায় ছিল না। তিনি ফক্সকে পরিশ্রমী, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল কর্মী হিসেবে বর্ণনা করেন।

চিকিৎসাবিদ্যায় পড়ার সুযোগ পাওয়ার পরও ফক্স নিজের অটিজমের বিষয়টি আড়াল করেননি। বরং মেডিকেল স্কুলের আবেদনে তিনি বিষয়টি উল্লেখ করেন। তার মতে, এটি তার জীবনের একটি অংশ এবং অটিজমের সঙ্গে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে রোগীদের বুঝতে তাকে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে।

বর্তমানে ফক্স ফিলাডেলফিয়া কলেজ অব অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিনে চিকিৎসাবিদ্যা পড়ছেন। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত এক লেখায় তিনি নিজেই তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অটিজম তার জন্য শুধু একটি চ্যালেঞ্জ নয়, রোগীদের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতাও তৈরি করেছে। বিশেষ করে অটিজমে আক্রান্ত রোগীরা জরুরি বিভাগে এলে তাদের আচরণ ও প্রয়োজন বুঝতে নিজের অভিজ্ঞতা তাকে সহায়তা করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

ফক্স আরও জানান, সামাজিক যোগাযোগের কিছু বিষয় তার জন্য এখনো সচেতনভাবে পরিচালনা করতে হয়। চোখে চোখ রাখা, অন্যের অঙ্গভঙ্গি বোঝা কিংবা কথার অন্তর্নিহিত অর্থ ধরার মতো বিষয়গুলো তিনি দীর্ঘদিনের অনুশীলনের মাধ্যমে আয়ত্ত করেছেন। কখনো কখনো কোনো কথাকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার কারণে ভুল বোঝাবুঝিও হতে পারে। তবে এসব অভিজ্ঞতাই তাকে অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও সচেতন করেছে।

চিকিৎসাবিদ্যায় তার যাত্রা এখন শেষ পর্যায়ের দিকে। তার সাম্প্রতিক পেশাগত তথ্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে চিকিৎসাবিদ্যার চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ফক্সের গল্পটি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের ঘটনা নয়, অটিজম নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। অটিজমে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তির সক্ষমতা, প্রয়োজন ও বিকাশের পথ এক নয়। তাই শৈশবের একটি নির্ণয় দিয়ে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ কতটা দূর যেতে পারবে, তা আগেভাগে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার অন্যতম উদ্দেশ্যও সেটিই বলে জানিয়েছেন ফক্স। তার মতে, অটিজম বা অন্য কোনো স্নায়ুবৈচিত্র্য একজন মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিই তার সক্ষমতার পুরো পরিচয় নয়। চিকিৎসক হওয়ার পথে এগিয়ে গিয়ে তিনি এখন এমন একটি পেশায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যেখানে নিজের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে রোগীদের আরও ভালোভাবে বুঝতে কাজে লাগাতে চান।

চার বছর বয়সে যাকে নিয়ে স্বাবলম্বী জীবনযাপন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, সেই ফক্স রাইকার এখন নিজের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি। তার যাত্রা দেখাচ্ছে, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা বা আশঙ্কা সবসময় তার শেষ পরিণতি নির্ধারণ করে না।

সূত্র: ফক্স রাইকারের লেখা, ফিলাডেলফিয়া কলেজ অব অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিন, সিবিএস ফিলাডেলফিয়া ও সেন্ট জোসেফস ইউনিভার্সিটি।

Logo

সম্পাদক ও প্রকাশক: মহিউদ্দিন সরকার