বিজ্ঞাপন
সৌদি আরবে একের পর এক হামলা, মক্কা চুক্তি কি এবার কার্যকর হবে?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৮ এএম
বিজ্ঞাপন
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে। সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকায় একের পর এক হামলা চালানো হচ্ছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে হামলার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেবকে হুমকির মুখে ফেলেছে। একই সময়ে ইরাক থেকেও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এসব হামলার জেরে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে। ফলে হরমুজ প্রণালির পর বাব আল-মান্দেবও যদি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
এমন পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে করা ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তির আওতায় কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ কীভাবে পাশে দাঁড়াবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
জাজানে ফের হুথি হামলা
সর্বশেষ সৌদি আরবের জাজান প্রদেশে হামলা চালিয়েছে হুথিরা। সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, রোববার একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন জাজানের আল-তুয়াল এলাকায় আঘাত হানে। এতে একটি মসজিদসহ বেশ কয়েকটি বাড়ি ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাজান ইয়েমেন সীমান্তবর্তী একটি প্রদেশ।
সৌদি কর্তৃপক্ষ হুথিদের এই হামলাকে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছে।
এর আগে হুথিরা সৌদির নাজরান প্রদেশের শারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানোর দাবি করে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ইরাক থেকেও তেল স্থাপনায় হামলা
শুধু ইয়েমেন নয়, ইরাক থেকেও সৌদি আরবের ওপর হামলা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর ইরাক থেকে ছোড়া ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
ইরাক সরকার স্বীকার করেছে, হামলাটি ইরানের সীমান্তবর্তী মাইসান প্রদেশ থেকে চালানো হয়েছিল। ঘটনার পর ওই প্রদেশের একজন সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বাগদাদ।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি তেল বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো সম্ভব হয়।
পাইপলাইনটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ পরিবহন করা হয়। ফলে এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারেও প্রভাব পড়তে পারে।
আপাতত পাল্টা হামলা নয়
ইরাক থেকে হামলার পরও সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর রিয়াদ আপাতত সংযত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা বন্ধে বাগদাদ যে উদ্যোগ নেবে, সৌদি আরব তা সমর্থন করবে। তবে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও তারা সংরক্ষণ করছে।
মক্কা চুক্তির সামনে বড় পরীক্ষা
সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলা এমন সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটি পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। চলতি বছরের আগস্টে তুরস্কও এতে যুক্ত হলে এটি ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়। তিন দেশ রিয়াদে একটি যৌথ সচিবালয়ও গঠন করেছে।
চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো তিন দেশের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। তবে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেবে, তার বিস্তারিত কাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অবশ্য সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিনা উসকানিতে হামলা হলে কিংবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে মক্কা চুক্তি কার্যকর হবে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এর আগে চুক্তিটির কাঠামোকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আক্রান্ত দেশকেই প্রথমে জানাতে হবে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন। সেই সহায়তা সরাসরি সামরিক অভিযান থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্য বা সামরিক সরঞ্জাম—যেকোনো কিছু হতে পারে।
পাকিস্তান কি ইয়েমেনে সেনা পাঠাবে?
এখন পর্যন্ত সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে মক্কা চুক্তি সক্রিয় করেনি। ফলে পাকিস্তান বা তুরস্কের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নও ওঠেনি।
তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে পাকিস্তান সৌদি আরবকে বিমান প্রতিরক্ষা, সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা সহায়তা বাড়াতে পারে। সৌদি আরবে এরইমধ্যে পাকিস্তানের প্রায় ১৬টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান, বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে।
তবে ইয়েমেনের ভেতরে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর সম্ভাবনা আপাতত কম। আফগানিস্তান যুদ্ধে জড়ানোর তিক্ত অভিজ্ঞতা পাকিস্তানকে এ ধরনের সংঘাতে সতর্ক করে তুলেছে।
ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অর্থনীতি, সাম্প্রদায়িক ভারসাম্য ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরাসরি যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাও কঠিন হতে পারে।
কূটনীতিতেই জোর ইসলামাবাদের
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
ইসলামাবাদ ইরানকে হুথিদের সৌদি আরবে হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে হুমকির মুখে ফেলা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথাও তেহরানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তুরস্কও কূটনৈতিকভাবে ইরান ও হুথিদের সংযত করার চেষ্টা করতে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
হুথিদের হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান ও তুরস্ক প্রথম পর্যায়ে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। বিমান প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তায় বহুজাতিক নৌজোট গঠনের উদ্যোগেও পাকিস্তান ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ মক্কা চুক্তি কার্যকর হওয়ার অর্থ অবিলম্বে ইয়েমেনে পাকিস্তানি বা তুর্কি সেনা পাঠানো নয়। বরং সৌদি আরব কী ধরনের সহায়তা চাইছে, তার ওপরই প্রতিক্রিয়ার মাত্রা নির্ভর করবে।
মক্কা চুক্তি এখনো একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামো। এর যৌথ সামরিক প্রতিক্রিয়া, পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম পুরোপুরি গড়ে উঠতে সময় লাগবে। কিন্তু সৌদি আরবের ওপর ধারাবাহিক হামলা এই চুক্তির জন্য প্রথম বড় বাস্তব পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ হতে পারে সৌদির প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, ইরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং বাব আল-মান্দেবের নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করা। এতে একদিকে রিয়াদের নিরাপত্তার প্রতি ইসলামাবাদের প্রতিশ্রুতি বজায় থাকবে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কম থাকবে।
শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সৌদি আরব আক্রান্ত হলে তিন দেশ কীভাবে সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেয় এবং সামরিক সহযোগিতার সীমা কোথায় নির্ধারণ করে তার ওপর।